প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার রাতের এ ঘটনায় রসায়ন বিভাগের চার শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনকে গুরুতর অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহতদের একজনকে পরে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে। একই সঙ্গে ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে তাৎক্ষণিকভাবে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, তদন্তের মাধ্যমে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাত ১০টার দিকে টিএসসিসিতে একটি অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা হয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও বিরোধ থামেনি। পরে সেটি একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
প্রথম দফায় নবাব আবদুল লতিফ হলের পেছনের এলাকায় দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি হয়। সেখানে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মারধর করেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এতে রসায়ন বিভাগের দুই শিক্ষার্থী আহত হন। ঘটনার জেরে পরে রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের একাডেমিক ভবনে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেন।
এ সময় ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন বলে জানা গেছে। এতে রসায়ন বিভাগের আরও দুই শিক্ষার্থী আহত হন। পরে উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়লে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরাও রসায়ন বিভাগের একাডেমিক ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালান। ফলে দুই বিভাগের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি অংশে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সংঘর্ষে আহত রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা হলেন ফেরদৌস হাসান, সাজিদুর, নোমান ও সামিন। তাঁদের মধ্যে ফেরদৌস হাসান ও সাজিদুরের আঘাত গুরুতর বলে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক সাজিদ হাফিজ জানান, সংঘর্ষের পর চার শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের মাথা ও চোখে আঘাত ছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আহত ফেরদৌস হাসানের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তাঁর চোখ ও মাথায় গুরুতর আঘাত থাকায় রাতেই তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সহপাঠীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। একটি তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ কীভাবে দ্রুত সহিংসতায় পরিণত হতে পারে, ঘটনাটি তারই একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, সংঘর্ষে রসায়ন বিভাগের ফেরদৌস হাসানসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত করার পাশাপাশি ঘটনার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলীম জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক সাইফুল ইসলামকে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন দর্শন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক সাহাল উদ্দিন। কমিটি ঘটনার সূত্রপাত, সংঘর্ষে জড়িত শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং একাডেমিক ভবনে ভাঙচুরের মতো পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো, তা খতিয়ে দেখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষে কারা প্রথমে হামলা করেছে এবং পরবর্তী সময়ে কারা প্রতিশোধমূলকভাবে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িয়েছে, তদন্তে এসব বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞানচর্চা ও মুক্ত মতবিনিময়ের জায়গা। সেখানে কোনো অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সামান্য মতবিরোধ যদি সংঘর্ষে রূপ নেয়, তা শুধু সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, পুরো ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে একাডেমিক ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতপার্থক্য সংঘর্ষে রূপ নিলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বুধবার রাতের ঘটনাতেও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পাশাপাশি দুই বিভাগের একাডেমিক ভবনে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে তদন্ত কমিটি গঠনের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরে যান। এতে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। তবে ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ এবং শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ঘটনার পর আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার দিকে সহপাঠীদের নজর রয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কী আসে এবং প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেও তাকিয়ে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। একটি চেয়ারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত যেন আরও বড় কোনো সংঘাতে রূপ না নেয়, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।