প্রকাশ: ০৮ অগাস্ট ‘ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আজ এক বছরের পূর্ণতা অর্জন করেছে। সেই বছরের পথচলায় রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুতর বৈষম্য দূরীকরণ, মৌলিক সংস্কার আর মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা নিয়ে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। তবে এক বছর শেষে এ সরকারের অর্জন এবং ব্যর্থতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ও আলোচনা তুঙ্গে রয়েছে। একদিকে যেখানে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও প্রগতির কাহিনি শোনা যায়, অন্যদিকে মানুষের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে দেখা দেয় ব্যাপক ফারাক।
অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা একমত যে, বর্তমান সরকারের অধীনে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষণীয় হয়নি। ‘মব’ দমনে ব্যর্থতা, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন ও ছিনতাইয়ের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও এখনও ব্যর্থতায় পড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে স্থবিরতা বিরাজ করছে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ সংকটে রয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার অনেক কমেছে, বেকারত্ব বাড়ছে, আর মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে যা সাধারণ মানুষের জীবনে কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। পাচারের টাকা দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি কিছু হলেও তা যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উৎপাদন খাতগুলোর সূচকগুলো সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
তবে এসব ব্যর্থতার মাঝে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্যও রয়েছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয় জাতীয় নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও সংবিধান সংশোধনসহ মৌলিক সংস্কারে অগ্রগতি। সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও ঐক্যের চেষ্টা চালিয়ে দেশের বিভিন্ন সংকট মিটিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষণ স্থাপন করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘দেশ এক ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উঠে এ পর্যায়ে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে, প্রশাসন সচল হয়েছে এবং বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা এসেছে এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য বজায় রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের সমালোচনা স্বাভাবিক, কিন্তু বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।’
অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, ‘জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। আমলাতন্ত্র ও পুলিশ বাহিনীতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি, যা দেশের উন্নয়নের বড় বাধা।’ তিনি বলেন, ‘বেসরকারি ও সরকারি খাতগুলোতে সংস্কার ও জবাবদিহিতার অভাব দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ৪ আগস্টের প্রতিবেদন বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার বিচার, সংস্কার, নির্বাচন প্রস্তুতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে আইনের শাসন ও স্বচ্ছতার ঘাটতি, রাজনৈতিক দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মামলা ও জামিন বাণিজ্যের কারণে রাষ্ট্র সংস্কারে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অ্যাড-হক প্রবণতা, সমন্বয়ের অভাব এবং সিদ্ধান্তহীনতা লক্ষ্য করা গেছে। দলীয়করণের বদলে নতুন দলীয়করণ গড়ে উঠেছে।
সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক বছর পূর্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের ১২টি সফলতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরেছে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং ব্যাংক খাত স্থিতিশীল হয়েছে।’ এছাড়া, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কারের বড় পদক্ষেপ। প্রবাসী ও নতুন ভোটার, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রায় ৮ লাখ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন থাকবে।’
বিচার ব্যবস্থায়ও অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে হত্যায় জড়িতদের বিচার শুরু হয়েছে, গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর হয়েছে এবং ৫০টির বেশি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেকের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম চলছে।
সংস্কারের জন্য সরকার ১১টি কমিশন গঠন করেছে, যা ১৬৬টি সুপারিশ নিয়ে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় লিপ্ত। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও গঠন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, যার ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ শিগগিরই স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অতীতের চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মাঝেও অন্তর্বর্তী সরকার এক বছরের দীর্ঘ পথে বড় ধরনের পরিবর্তন ও সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দেশের জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক কাটিয়ে ওঠার জন্য এখনো অনেক দূর যেতে হবে। আগামী দিনে এই সরকার কতটুকু সফল হবে, তা সময়ই দেখাবে।