প্রকাশ: ২৩ অগাস্ট ’২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের বলে শনাক্ত করেছেন তাঁর স্বজনেরা। শুক্রবার রাত পৌনে নয়টার দিকে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে গিয়ে বিভুরঞ্জনের ছেলে ঋত সরকার ও ভাই চিররঞ্জন সরকার মরদেহটি শনাক্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে গতকাল সকাল থেকে নিখোঁজ থাকা এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের পরিণতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৭১ বছর বয়সী বিভুরঞ্জন সরকার দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক আজকের পত্রিকা-তে জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে তিনি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হলেও আর ফেরেননি। বিকেল পাঁচটার মধ্যে বাসায় ফেরার কথা থাকলেও তিনি ফিরতে দেরি করেন। পরিবার প্রথমে ভেবেছিল তিনি হয়তো দেরি করছেন, কিন্তু রাত গড়ালেও তার খোঁজ না মেলায় উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে ছেলে ঋত সরকার রমনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
আজ শুক্রবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বলাকির চর এলাকায় স্থানীয়রা নদীতে ভাসমান একটি লাশ দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তারা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে কলাগাছিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠান। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ মরদেহের ছবি তুলে ঢাকার রমনা থানায় পাঠায়। সেখানে পরিবারের সরবরাহ করা বিভুরঞ্জন সরকারের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রাথমিকভাবে মিল পাওয়ার পর পরিবারকে জানানো হয়, এরপর তার ছেলে ও ভাই মুন্সিগঞ্জে গিয়ে মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করেন।
এদিকে, বিভুরঞ্জনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে এক অনলাইন সংবাদমাধ্যমে তাঁর লেখা একটি ‘খোলা চিঠি’ প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে তিনি ওই লেখা ইমেইলে পাঠিয়েছিলেন। লেখাটির ফুটনোটে বিভুরঞ্জন লিখেছিলেন—“জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।” চিঠিতে তিনি সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, দেশের গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা, নিজের ও পরিবারের নানা দুরবস্থা নিয়ে হতাশার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে দীর্ঘ অসুস্থতায় ভোগা নিজের শারীরিক সমস্যা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনের ব্যর্থতা, মেয়ের পরীক্ষায় ব্যর্থতা এবং পরিবারের আর্থিক সংকট—এসব বিষয়ে তিনি খোলাখুলি লিখেছিলেন।
প্রবীণ এই সাংবাদিকের মৃত্যুতে গণমাধ্যম অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মীরা বলছেন, দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন এক নিষ্ঠাবান সংবাদকর্মী, যিনি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সততা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যু কেবল পরিবার ও সহকর্মীদের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য এক গভীর ক্ষতি হয়ে থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলেছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে এই মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
বছরের পর বছর ধরে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পেশাগত চাপের মধ্যে সাংবাদিকরা যে ভঙ্গুর অবস্থায় কাজ করছেন, বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুর ঘটনায় সেই বাস্তবতাই আবারও সামনে চলে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, এই মৃত্যু তদন্তের মাধ্যমে নতুন কোনো সত্য উন্মোচিত হয় কি না।