প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সোমবারের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) মন্দির পরিদর্শনে যাচ্ছেন। এই পরিদর্শনটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কারণ দুর্গাপূজা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব যা দেশের বহুসংস্কৃতির চিত্রকে সমৃদ্ধ করে।
এর আগে সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিভিন্ন পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা। এই সাক্ষাতে তারা আসন্ন দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং প্রধান উপদেষ্টাকে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। সাক্ষাতে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পূজা মণ্ডপের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, চলতি বছরের পূজা মণ্ডপের সংখ্যা এক হাজারের বেশি বেড়ে গেছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাক্ষাতের সময় বলেন, “আপনাদের সঙ্গে সবসময় দেখা করার ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ হয় না। পূজা উপলক্ষে বছরে একবার সামনাসামনি দেখা হয়, কথা বলার সুযোগ হয়। আমি আজ এখানে এসেছি সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ ও সমর্থন দুর্গাপূজা উৎসবকে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ জানান, এবারও সরকারের সকল পক্ষ থেকে পূজায় পূর্ণ সহযোগিতা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য তারা ধন্যবাদ জানান। তারা উল্লেখ করেন, প্রতিটি মন্দির এবং পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তা, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রস্তুতি গুরুত্বসহকারে সম্পন্ন হচ্ছে, যাতে উৎসব নির্বিঘ্নে এবং আনন্দময়ভাবে উদযাপিত হয়।
মহানগর পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান স্থায়ী দুর্গামন্দিরের জন্য রেল মন্ত্রণালয় থেকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার জন্য। এই বরাদ্দ স্থানীয় পূজা কমিটিগুলোর কার্যক্রমকে আরও সহজ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের সাথে আলোচনায় প্রধান উপদেষ্টা সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং দুর্গাপূজা চলাকালীন সময়ে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা ষড়যন্ত্র এড়াতে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
সাক্ষাতের সময় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার ও সচিব দেবেন্দ্র নাথ উঁরাও। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী পূর্ণাআনন্দ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতির সভাপতি অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, শ্রী শ্রী গীতা হরি সংঘ দেব মন্দিরের সভাপতি শ্রী বিমান বিহারী তালুকদার, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব এস এন তরুণ দে, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক অপর্না রায় দাস, শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র দত্ত ও সিদ্ধেশ্বরী সার্বজনীন পূজা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রণীতা সরকার।
ধর্মীয় নেতারা জানান, পূজা মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ভক্তদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন ও পূজা কমিটি যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এছাড়া সারাদেশে পূজা মণ্ডপের প্রস্তুতিও পুরোদমে চলছে। নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার এই পরিদর্শন ধর্মীয় সহমর্মিতা, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সামাজিক সংহতির প্রতীক হিসেবে গুরুত্ব বহন করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পরিদর্শনের সময় মন্দিরের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পূজামণ্ডপের স্থান এবং ভক্তদের নিরাপদে পূজা উদযাপনের জন্য নেওয়া প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করবেন। তিনি উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবেন এবং নিশ্চিত করবেন যে, উৎসবটি নির্বিঘ্ন ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে।
ধর্মীয় নেতাদের পক্ষ থেকে জানা গেছে, পূজার সময় সরকারি সাহায্য এবং প্রশাসনিক তদারকি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই সমন্বয় ছাড়া দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনা সম্ভব নয়। প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতি এই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক বজায় রাখবে।
এছাড়াও উল্লেখ করা হয়, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি, অগ্নি সুরক্ষা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য প্রতিটি পূজা মণ্ডপকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন পর্যায়ক্রমে সমস্ত মণ্ডপের নিরাপত্তা পরিদর্শন করবেন। প্রধান উপদেষ্টার এই তত্ত্বাবধান এই নির্দেশনাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
এই পরিদর্শন বাংলাদেশের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সমন্বয়কে শক্তিশালী করার দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। দেশের অন্যান্য অংশ থেকে আগত ভক্তরা নিরাপদে ও আনন্দের সঙ্গে পূজা উদযাপন করতে পারবে এবং সরকারের তদারকি ও সহযোগিতা এই উপলক্ষে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করবে।
সমগ্র প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানকে আরও সুসংহত এবং নিরাপদ করা সম্ভব হবে। প্রধান উপদেষ্টার এই পরিদর্শন একই সঙ্গে ধর্মীয় সহমর্মিতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক তদারকির একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।