রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বগতি, রিজার্ভে স্বস্তি— চাপমুক্ত বৈদেশিক লেনদেন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
নভেম্বরের ১৬ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ বজায় রেখেছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২০ দিনেই দেশে এসেছে ১৯০ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৩ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২১.৭৫ টাকা ধরে হিসাব করা হয়েছে)। রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য প্রকাশ করে জানায়, এই ধারা অব্যাহত থাকলে মাস শেষে রেমিট্যান্স আয় নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দুই মাস ২০ দিনে প্রবাসী আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের আগস্ট মাস থেকেই রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবাহ শুরু হয়, যা এখনো বহমান। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এক ধরনের স্বস্তি ফিরেছে এবং দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক সাড়া তৈরি করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয়ের এই ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকগুলো প্রবাসী আয় থেকে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পূরণ করছে, পাশাপাশি অতিরিক্ত ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকে বিক্রি করছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

এই রিজার্ভ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে দেশের আমদানি ব্যয় নির্বিঘ্নে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা বজায় থাকছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্যশস্য ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে নতুন করে ইতিবাচক মূল্যায়ন করার সম্ভাবনা দেখছে।

প্রবাসী আয় বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে নতুন করে কর্মী প্রেরণ এবং বিদ্যমান শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি প্রভাব ফেলছে। দ্বিতীয়ত, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা কিছুটা কমে এসেছে, যার পেছনে রয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপ। ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্সে বাড়তি প্রণোদনা দিচ্ছে, যার ফলে বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ উৎসাহিত হয়েছে।

এছাড়া বৈদেশিক ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাড়ানো হয়েছে, যাতে দ্রুত এবং নিরাপদে অর্থ দেশে পাঠানো যায়। সরকারের পক্ষ থেকে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা চালু থাকায় প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে আরও উৎসাহী হচ্ছেন।

রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে প্রবাসী আয়ের অর্থ সরাসরি ব্যয় হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং ছোটখাটো ব্যবসা খাতে। এতে গ্রামীণ মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে ভোক্তা ব্যয় বাড়ছে।

অন্যদিকে, এই প্রবাহ দেশের আর্থিক খাতকে আরও গতিশীল করছে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট কমছে এবং সরকার ডলার বাজারে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে ডলার সংকটে আমদানি ব্যয় নির্বাহে সমস্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, সেখানে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় এখন বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক ঋণ শোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় নির্বাহ করা সহজ হচ্ছে। বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে আমদানি খরচ বেড়েছে, কিন্তু প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ সেই চাপ মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখছে।

এদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। এটি শুধু বৈদেশিক লেনদেন চাপমুক্ত করছে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এখনো স্থিতিশীল রিজার্ভ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশকে একটি শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শিল্পায়ন, রপ্তানি খাত ও বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধিতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রেমিট্যান্স যতই প্রবাহিত হোক না কেন, যদি রপ্তানি আয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়ে, তবে বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।

প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই ধারা টেকসই করতে সরকারের আরও পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শ্রমবাজার বৈচিত্র্য আনতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে কর্মী প্রেরণের ওপর চাপ না পড়ে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রবাসী কর্মীদের আয় বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করতে হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, চলতি মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের স্বস্তি ফিরিয়েছে। আমদানি ব্যয় নির্বাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থিতিশীল রাখা এবং আর্থিক খাতের সংকট মোকাবিলায় এই প্রবাহ শক্ত ভরসা জুগিয়েছে। যদিও সামনে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবুও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ দেশকে বৈদেশিক লেনদেনে চাপমুক্ত রাখতে ইতিবাচক অবদান রাখছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত