ঢাকায় টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৯৫ বার
ঢাকায় টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সোমবার ভোররাত থেকে রাজধানী ঢাকায় শুরু হওয়া প্রবল বর্ষণ সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত নগরবাসীর জীবনে চরম ভোগান্তি তৈরি করেছে। রবিবার গভীর রাত থেকেই আকাশে বজ্রপাতসহ শুরু হয় বৃষ্টিপাত, যা ভোরের দিকে আরও তীব্র আকার ধারণ করে। প্রথমদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও ভোর সাড়ে পাঁচটার পর থেকে অঝোর ধারা নামতে থাকে, যা অনেক এলাকা কার্যত অচল করে ফেলে। নগরীর রাস্তাঘাটে পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, বন্ধ হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক যান চলাচল, আর তার সাথে জুটেছে অফিসগামী মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ।

সকালে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানজট তৈরি হয়। অফিসগামী মানুষ, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। যারা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেছেন তাদেরও আটকে থাকতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অন্যদিকে যারা বাস বা রিকশার মতো গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল, তারা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপাকে। মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, মানিক মিয়া এভিনিউ, ধানমন্ডি, আসাদগেট, ঝিগাতলা, গাবতলীসহ নানা এলাকায় পানি জমে হাঁটুপানি থেকে কোমরসমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকার মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেননি; অনেক বাসার ভেতরে পানি ঢুকে পড়েছে।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে বৃষ্টিতে ভিজে অপেক্ষমাণ সানোয়ার হোসেন নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অফিসে যেতে হলে আজ ভিজেই যেতে হবে। হাতে ছাতা থাকলেও এই প্রবল বর্ষণে কোনো কাজে আসছে না। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে না। সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারবো কিনা তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। আর দেরি হলে বেতনের কাটা অনিবার্য।” একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন গুলিস্তান ও শ্যামলীর যাত্রীরাও।

ঢাকার নগরবাসীর কাছে জলাবদ্ধতা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতি বর্ষাতেই এ শহরের মানুষকে একই ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশ্বাস সত্ত্বেও এ সমস্যার কার্যকর সমাধান আজও হয়নি। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা, সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং খাল ভরাটের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু সড়ক নদীতে পরিণত হয়।

সোমবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিগুলোতে দেখা যায়, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে গাড়ি থেমে আছে পানির কারণে। অনেক রিকশা, সিএনজি, এমনকি প্রাইভেটকার পর্যন্ত পানিতে আটকে পড়েছে। কোথাও আবার দেখা গেছে মানুষ কোমরসমান পানির ভেতর দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। কয়েকজন বাসযাত্রীকে দেখা গেছে ভিজে কাপড়েই অফিসমুখী হতে।

শুধু রাস্তাঘাট নয়, ঘরবাড়িতেও সৃষ্টি হয়েছে সমস্যার। কলাবাগান, মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলীসহ নিচু এলাকাগুলোতে ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। ভোরে বৃষ্টি শুরু হওয়ার সাথে সাথে অনেক পরিবারকে তড়িঘড়ি করে জিনিসপত্র সরাতে দেখা গেছে। বিশেষ করে দিনের শুরুতে শিক্ষার্থী ও শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সময়টা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পরিণত হয়।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন দেশের সব বিভাগেই হালকা থেকে মাঝারি এবং কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণ হতে পারে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বেশ কিছু এলাকায় এবং রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকটি স্থানে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাঝারি ধরনের ভারি বর্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা। অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, খাল দখল এবং জলাধার ভরাটের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। এতে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ডুবে যায়। নগরবিদরা বারবার সতর্ক করলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা ড্রেন পরিস্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে নগরবাসীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। অনেক নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, সিটি করপোরেশনের আশ্বাস কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। বৃষ্টির সময় এ সমস্যার তীব্রতা বেড়ে যায় এবং তাৎক্ষণিক কোনো সমাধানও পাওয়া যায় না।

যানজটের কারণে সোমবার রাজধানীতে অনেক অফিসে কর্মচারীদের অনুপস্থিতি দেখা গেছে। যারা কোনোভাবে পৌঁছাতে পেরেছেন তাদেরও ভিজে বা দেরিতে অফিসে আসতে হয়েছে। অনেক স্কুল ও কলেজে ক্লাস শুরু দেরিতে হয়েছে বা আংশিকভাবে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে, বারবার একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হওয়া সত্ত্বেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না।

সাধারণ মানুষ মনে করেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। খাল উদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নগর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বৃষ্টির মৌসুমে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, সেপ্টেম্বর মাসে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরও কয়েক দফা ভারি বর্ষণ হতে পারে। ফলে নগরবাসীকে আরও কিছু দিন এমন ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে। তারা সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের মানুষকে প্রস্তুত থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন।

রাজধানীর মানুষের আশা, কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রতিবারই বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতার সমস্যা সাময়িকভাবে আলোচনায় আসে, কিন্তু কয়েক দিন পরই তা ভুলে যাওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়িত না হয় এবং জলাধার ও খাল উদ্ধার কার্যক্রম যদি দৃশ্যমানভাবে না এগোয়, তাহলে ভবিষ্যতে ঢাকার মানুষকে আরও ভয়াবহ দুর্ভোগের মুখে পড়তে হবে।

নগরীর প্রতিটি সড়কে ছড়িয়ে থাকা আজকের ছবিগুলো শুধু একটি দিনের দুর্ভোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অকার্যকারিতার প্রতিচ্ছবি। নাগরিকরা বলছেন, এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান ছাড়া রাজধানীর উন্নয়ন ও আধুনিক নগরীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত