প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলমান অধিবেশনের ফাঁকে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এরদোয়ান সরাসরি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দায়ী করে বলেন, গাজায় চলমান হত্যাযজ্ঞ এবং তীব্র মানবিক বিপর্যয় তার কারণে সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি একে অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারব না। এটি সম্পূর্ণ গণহত্যা। নেতানিয়াহুর নির্মমতার কারণে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছেন।”
এরদোয়ান আরও বলেন, গাজার মানুষের উপর হামলার ফলে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তিনি এই হত্যাযজ্ঞের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গাজায় চলমান সংঘাতের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পুনরায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস এবং ইসরাইলি জিম্মিদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ফক্স নিউজকে মন্তব্য করতে গিয়ে এরদোয়ান বলেন, “এটি একতরফা অপরাধ নয়। শুধু হামাসকে দোষারোপ করা সঠিক হবে না। নেতানিয়াহু যা করেছেন তা আমরা কীভাবে একপাশে সরিয়ে রাখতে পারি?” তিনি ইসরাইলকে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে হামলার জন্য অভিযুক্ত করেন এবং উল্লেখ করেন, “অস্ত্রের ক্ষেত্রে হামাসের সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক শক্তির তুলনা করা যায় না। ইসরাইল তার সামরিক শক্তি নির্দয়ভাবে ব্যবহার করছে। তাদের কোনো করুণা নেই।”
এরদোয়ান হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, “আমি হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে দেখি না। বরং আমি একে একটি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হিসেবে মনে করি। তারা আত্মরক্ষার জন্য যা কিছু আছে তা ব্যবহার করছে।” তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ এটি ফিলিস্তিনি সংস্থাগুলোর প্রতি সমর্থনের প্রকাশ এবং গাজায় সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে তুরস্কের অবস্থান স্পষ্ট করে।
এরদোয়ান বলেন, গাজায় সংঘাত অবসানের সম্ভাবনা খুবই সীমিত। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, কোনো দ্রুত সমাধান না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হতে পারে। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তৎপরতা ছাড়া ইসরাইলি হামলা ও মানবিক বিপর্যয় বন্ধ করা সম্ভব নয়।
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সংখ্যা এবং চলমান মানবিক সংকট সম্পর্কে তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৬৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শিশু, নারী ও বয়স্কদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বিশাল সংখ্যক মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হিসেবে সংকটাপন্ন জীবনযাপন করছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই গাজার পরিস্থিতিকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এরদোয়ানের মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তুরস্কের অবস্থান ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমর্থনকে আন্তর্জাতিকভাবে দৃঢ় করছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কার্যক্রম নিয়ে সতর্ক করছে।
এরদোয়ান বলেন, “গাজার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হচ্ছে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করা। শুধুমাত্র কূটনৈতিক বিবৃতি দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করা সম্ভব নয়। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।” তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গাজার মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। এছাড়া তিনি তুরস্কের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জন্য তাত্ক্ষণিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন সরকারী সংস্থা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে।
এরদোয়ান ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে একটি “অস্ত্র নির্ভর ও অবিচ্ছিন্ন শক্তি প্রদর্শন” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “ইসরাইলের হামলা শুধুমাত্র প্রতিরোধকারী গোষ্ঠী হামাসকে লক্ষ্য করে নয়, বরং বেসামরিক মানুষকেও তারা লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন।”
গাজার পুনর্গঠন এবং আহতদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তুরস্ক আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এরদোয়ান আশা প্রকাশ করেছেন, বৈশ্বিক সম্প্রদায় গাজার মানবিক সঙ্কটের সমাধান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে প্রস্তুত। গাজায় শান্তি এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য।”
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এরদোয়ানের মন্তব্য ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের সংঘাতের প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আরও বাড়াবে। বিশেষ করে জাতিসংঘে বক্তব্যের মাধ্যমে তুরস্কের অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এরদোয়ানের বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এক স্পষ্ট সংকেত দিয়েছে যে, গাজার পরিস্থিতি আর অবহেলার সুযোগ নেই। তিনি মানবিক সহায়তা, শান্তি প্রক্রিয়া এবং ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছেন। এই আহ্বানকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে।
গাজার মানুষদের ভেতর ভয়, উদ্বেগ এবং নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা, শিশু ও মহিলাদের প্রাণহানি, এবং মৌলিক চাহিদার অভাব এই সংকটকে তীব্র করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এরদোয়ানের বক্তব্যের মাধ্যমে তুরস্ক বিশ্ব সম্প্রদায়কে এই মানবিক সংকট সমাধানের জন্য সক্রিয় করতে চাচ্ছে।
এই সংকট এবং এরদোয়ানের মন্তব্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাজার পুনর্গঠন, মানবিক সহায়তা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপ অবিলম্বে প্রয়োজন।