প্রকাশ ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকায় মুক্তির পর থেকে দর্শকপ্রিয়তায় আলোচনায় থাকা ইরানি চলচ্চিত্র ‘ফেরেশতে’ দ্বিতীয় সপ্তাহেও রাজধানীর প্রেক্ষাগৃহে চলছে। সিনেমার কেন্দ্রবিন্দুতে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং তাদের মানবিকতা ও ত্যাগের গল্প ফুটে উঠেছে। গার্মেন্টস কর্মী ফেরেশতে এবং তার স্বামী আমজাদের জীবনযাত্রা, তাদের ছোট ছোট স্বপ্ন, আর প্রতিবেশী বধির শিশুর প্রতি দায়িত্বশীলতা দেখানো হয়েছে। নিঃসন্তান হলেও তারা স্বার্থপরতা ত্যাগ করে শিশুটি নিজের কাধে তুলে নেন। জীবনযুদ্ধে সীমিত অর্থ ও সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তারা পরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, যা সিনেমার আবেগকে গভীর করে তোলে।
জয়া আহসান অভিনীত ফেরেশতে চরিত্রটি একাধারে সহমর্মী, সাহসী ও ত্যাগী। কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি নীরবে লড়াই চালান, সংসার এবং সম্মান দুটোই রক্ষা করেন। সুমন ফারুকের আমজাদ চরিত্রে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের প্রতিকূলতাকে সহ্য করা, সৎ এবং পরিশ্রমী হলেও সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা চিত্র। দুই অভিনেতার অভিনয়ের ভারসাম্য সিনেমার আবেগকে শক্তিশালী করেছে। এছাড়া রিকিতা নন্দিনী শিমু, শহীদুজ্জামান সেলিম, শাহেদ আলী, শাহীন মৃধা এবং শিশুশিল্পী সাথীর উপস্থিতিও ছবিটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
চিত্রনাট্য লিখেছেন ড. মুমিত আল রশিদ। নির্মাণে ইরানি চলচ্চিত্র-ঘরানার প্রভাব স্পষ্ট। ক্যামেরার স্থিরতা, সংলাপের সরলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তের সূক্ষ্ম চিত্রায়ন সিনেমাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ঢাকাকে এখানে শুধুমাত্র শহরের পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি; বরং ফুটপাত, গলি এবং শ্রমজীবী মানুষের ঘরবাড়ি প্রদর্শনের মাধ্যমে শহরটিকে এক জীবন্ত চরিত্রে রূপ দেওয়া হয়েছে।
‘ফেরেশতে’ মুক্তির আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। ইরানের ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে ২৭০টি ছবির মধ্যে এটি সমালোচকদের প্রশংসা ও পুরস্কার লাভ করে। ভারতের গোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও ১৩০টি ছবির মধ্যে ছবিটি পুরস্কৃত হয়। এছাড়া ‘দ্বাবিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর উদ্বোধনী ছবি হিসেবে প্রদর্শিত হয়, যেখানে দেশি ও আন্তর্জাতিক সিনেমাবিদরা ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। শর্মিলা ঠাকুর ছবিটি নিয়ে মন্তব্য করেন, “সহজ, সরল, সুন্দর সিনেমা। অভিনয়শিল্পীদের পারফর্মেন্স ছবিটিকে অনেকদূর নিয়ে যাবে।”
ইরানি পরিচালক মুর্তজা অতাশ জমজমের নির্মিত ‘ফেরেশতে’ ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর থেকেই দর্শক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর ৫৫তম জন্মদিন উপলক্ষে ছবিটি মুক্তি পায়। বর্তমানে স্টার সিনেপ্লেক্স, লায়ন সিনেমাস এবং যমুনা ব্লকবাস্টার্সে নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে।
প্রযোজক ও অভিনেতা সুমন ফারুক জানান, “আমাদের লক্ষ্য কেবল ব্যবসা করা ছিল না। আমরা চাই একটি ভালো গল্পের সিনেমা উপহার দিতে। নতুন নির্মাতাদের সিনেমা হলে ছবি প্রদর্শন করানো সত্যিই কঠিন। দর্শকরা সিনেমাকে প্রথম সপ্তাহ থেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে এগিয়ে নিতে পারেন। সৌভাগ্যবশত দর্শকদের কাছ থেকে আমরা প্রত্যাশিত সাড়া পেয়েছি, যার ফলে দ্বিতীয় সপ্তাহেও ছবি চলমান। পূজার সময়ে দর্শকদের আগ্রহ আরও বাড়বে, আশা করি মুখে মুখে প্রচারণার মাধ্যমে সিনেমাটি আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে থাকবে।”
ছবির গল্পে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধের চিত্রায়ন, অভিনয় এবং চিত্রনাট্য দর্শকদের আবেগকে স্পর্শ করেছে। জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি ছোট ছোট স্বপ্নের ত্যাগ ও সম্পর্কের দৃঢ়তা চলচ্চিত্রটিকে অন্যরকম গভীরতা দিয়েছে। সিনেমায় প্রতিটি চরিত্রের বাস্তবিক উপস্থাপন এবং নীরবভাবে চলমান সংগ্রামের দৃশ্য দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে।
ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে দ্বিতীয় সপ্তাহের চলাচল প্রমাণ করছে, দর্শকরা গল্প ও অভিনয়ের গভীরতাকে মেনে নিয়েছেন। সিনেমাটির সাফল্য কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং এটি সামাজিক ও মানবিক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, মানবিকতা এবং সম্পর্কের মূল্য তুলে ধরা হচ্ছে।
সর্বশেষে বলা যায়, ‘ফেরেশতে’ শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, এটি দর্শকদের মানবিক মূল্যবোধ এবং জীবনসংগ্রামের চিত্র তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, দর্শকপ্রিয়তা এবং শিল্পসম্মত নির্মাণের সমন্বয়ে ছবিটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রেক্ষাপটে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।










