বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে ভুটানের আগ্রহ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩৩ বার
বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে ভুটানের আগ্রহ

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভুটান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে জানিয়েছেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার লক্ষ্যে তার সরকার বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে চায়। তিনি মনে করেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে শুধু দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কই সুদৃঢ় হবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

শুক্রবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক বৈঠকে শেরিং তোবগে এ প্রস্তাব দেন। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে, যেখানে দুই দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, গেলেপু মাইন্ডফুলনেস সিটি (জিএমসি) নামে তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কুড়িগ্রামে ভুটানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ করা বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করলে উভয় দেশ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে। তার মতে, এই ধরনের সংযোগ একদিকে বিনিয়োগ বাড়াবে, অন্যদিকে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সহজ হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উদ্যোগটি বাংলাদেশ ও ভুটানের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রস্তাবকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভুটান ঐতিহাসিকভাবেই একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র, এবং উন্নত যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই সম্পর্ককে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তিনি দুই দেশকেই বিদ্যমান সব সুযোগ অনুসন্ধান করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

বৈঠকে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ধর্মীয় পর্যটন প্রসারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভুটানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বৌদ্ধ ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে যেখানে বাংলাদেশি বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সহজে ভ্রমণ করতে পারবেন। তার মতে, এ উদ্যোগ ধর্মীয় পর্যটনকে সমৃদ্ধ করবে এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও মজবুত করবে।

শেরিং তোবগে আরও জানান, ভুটান তার জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে বাংলাদেশের জন্য কাজে লাগাতে চায়। ইতোমধ্যেই দেশটি নেপাল ও ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতা জোরদার করেছে, এবার বাংলাদেশকে যুক্ত করলে এ সহযোগিতা আঞ্চলিক পর্যায়ে এক নতুন মাইলফলক হবে। একই সঙ্গে ভুটানের ওষুধশিল্পে বাংলাদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশি ঔষধ শিল্প ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে, এবং ভুটানে যৌথ উদ্যোগে এ খাত নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ভুটান শুধু বিদ্যুৎ বা ওষুধ খাতেই নয়, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোতেও বাংলাদেশকে অংশীদার করতে চায়। বৈঠকে শেরিং তোবগে বিশেষভাবে ফাইবার অপটিক সংযোগ স্থাপনের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি মনে করেন, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দুই দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংযুক্ত হলে ভুটান ও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে।

বৈঠকে দুই নেতা রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা করেন। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে তাদের দেশ সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী এবং আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ আয়োজিত পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ভুটান অংশ নেবে। তার মতে, এ সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি মানবিক চ্যালেঞ্জ, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া সমাধান করা সম্ভব নয়।

শেরিং তোবগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বেরও উচ্চ প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন সঠিক নেতৃত্বে রয়েছে।” তাকে শ্রদ্ধাভরে সম্বোধন করে তিনি ড. ইউনূসকে নিজের ব্যক্তিগত আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, “মাই প্রফেসর।” এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, ব্যক্তিগতভাবে ড. ইউনূসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা পোষণ করেন।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি থিম্পুতে উদ্বোধন হওয়া বাংলাদেশের নতুন চ্যান্সারি ভবনের নকশারও প্রশংসা করেন। ভবনটি “হিমালয়ের পাদদেশে বঙ্গোপসাগর” থিমে নির্মিত হয়েছে, যা দুই দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এ ধরনের স্থাপনা কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। শেরিং তোবগে এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে জানান, তিনি সম্ভবত আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ সফর করবেন। এ সফরকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভুটানের সম্পর্কের ইতিহাসে এ ধরনের আলোচনা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দুই দেশ এখন আর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জলবিদ্যুৎ, ঔষধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, পর্যটন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশ একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য ভুটানের এ প্রস্তাব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও চীনের প্রভাবাধীন অঞ্চলে ছোট দেশ হিসেবে ভুটান যদি বাংলাদেশের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরে এগিয়ে আসে, তবে তা শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করবে। অপরদিকে, বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন বাজার উন্মোচন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।

সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত বৈঠক শুধু দুই দেশের নেতাদের কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময় নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি দিকনির্দেশনাও বয়ে এনেছে। বাংলাদেশ ও ভুটানের অর্থনৈতিক সহযোগিতা যদি বাস্তব রূপ পায়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে এবং বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আলোচনায় যে আশাবাদ প্রকাশ পেয়েছে, তা নিঃসন্দেহে দুই দেশের জনগণের জন্য ইতিবাচক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত