দেশ পুনর্গঠনে প্রবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৮৯ বার
রাজনৈতিক দল ও কমিশন ইতিহাস রচনা করেছে: ড. ইউনূস

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুনর্গঠনের যে স্বপ্ন জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর জেগে উঠেছে, তা বাস্তবায়নে দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা হতে পারেন বড় সহায়ক শক্তি। শুধু অর্থনৈতিক অবদান নয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মত দেন তিনি।

‘এনআরবি কানেক্ট ডে: এমপাওয়ারিং গ্লোবাল বাংলাদেশি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস এক আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক নতুন যাত্রাপথে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে আমরা আর খেলা দেখব না। সময় এসেছে মাঠে নেমে খেলার। দেশ গঠনের দায়িত্ব আমাদের সবার।” তিনি উল্লেখ করেন, দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশিরা জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই তারা দূরত্বে থাকলেও দায়িত্ব থেকে মুক্ত নন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সফররত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। জাতিসংঘে অংশগ্রহণের এই সফরে বিএনপি, জামায়াত এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিনিধিরা যোগ দেন। প্রধান উপদেষ্টা এ কারণে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হওয়া একটি আশাব্যঞ্জক লক্ষণ। তিনি স্বীকার করেন, “তাদের উপস্থিতি আমাদের আস্থা অনেক বাড়িয়েছে এবং প্রমাণ করেছে যে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব সবার।”

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন একটি বিশদ প্রেজেন্টেশন দেন। সেখানে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গত ১৫ মাসে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহে ২১ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন তিনি, যা প্রবাসীদের সক্রিয় অবদান ছাড়া সম্ভব হতো না। তিনি আরও জানান, সরকার ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হন।

তিনি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পদ্ধতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। তার মতে, এই অংশগ্রহণ শুধু গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করবে না, বরং প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের যোগসূত্রও আরও গভীর করবে।

অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল দুটি প্যানেল আলোচনা। প্রথমটি, ‘ব্রিজিং বর্ডারস: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ডায়াস্পোরা এনগেজমেন্ট’, যা সঞ্চালনা করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। এই আলোচনায় অংশ নেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ আরও দুইজন। তারা বাংলাদেশের প্রবাসী নীতি, কর্মসংস্থান সুযোগ এবং প্রবাসীদের কল্যাণে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে মতামত দেন। আলোচনায় উঠে আসে, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানকে শুধু রেমিট্যান্সে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার সংযোগ তৈরি করতে হবে।

এরপর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য-সচিব আখতার হোসেন বক্তব্য দেন। তারা অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। মির্জা ফখরুল বলেন, “গণআন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটেছে, এখন সেই পরিবর্তনকে টিকিয়ে রাখা সবার দায়িত্ব।” ড. তাহের উল্লেখ করেন, “দেশের পুনর্গঠন কেবল রাজনৈতিক শ্লোগানে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধভিত্তিক একটি শিক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি।” অন্যদিকে আখতার হোসেন বলেন, “আমরা যদি দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাজ করি, তবে বাংলাদেশকে সত্যিকারের জনগণের রাষ্ট্রে রূপ দেওয়া সম্ভব।”

দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনা ‘শেপিং টুমোরো: দ্য ফিউচার অব বাংলাদেশ’ পরিচালনা করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। এতে বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির, জামায়াত নেতা নাকিবুর রহমান এবং এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা অংশ নেন। আলোচকরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক সংস্কারের সম্ভাবনা নিয়ে তাদের অভিমত প্রকাশ করেন। আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নয়ন। বক্তারা উল্লেখ করেন, প্রবাসীদের প্রযুক্তি জ্ঞান ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

অনুষ্ঠানে আরও একটি বিশেষ ঘোষণা আসে—‘শুভেচ্ছা’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপ উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টা। এই অ্যাপ প্রবাসীদের জন্য বহুমুখী সেবা প্রদান করবে। এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ নির্দেশনা, আইনগত পরামর্শ, কর্মসংস্থান সুযোগ এবং জরুরি পরিষেবার তথ্য। অ্যাপটি প্রবাসীদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ আরও সহজ করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তার বক্তৃতার শেষে বলেন, “বাংলাদেশ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সামনের পথ সহজ নয়, কিন্তু আমরা যদি সবাই মিলে এগিয়ে যাই, তবে কোনো বাধাই অতিক্রম করা অসম্ভব হবে না। দেশে যেমন মানুষ স্বপ্ন দেখছে, বিদেশে থাকা প্রবাসীরাও একই স্বপ্ন দেখুক। এই স্বপ্ন একদিন বাস্তব হবেই।”

প্রবাসীদের উদ্দেশে তার আহ্বান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট: আর্থিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার প্রক্রিয়ায়ও অংশ নিতে হবে। বাংলাদেশকে যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে হয়, তবে প্রবাসীদের সক্রিয় অবদান অনিবার্য।

এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশ নতুন করে রাষ্ট্র কাঠামো ও সামাজিক সংস্কার নিয়ে ভাবছে, প্রবাসীদের ভূমিকা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্য ভবিষ্যতের রাজনৈতিক রূপরেখায় গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা হতে পারে। নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানটি শুধু প্রবাসীদের সংযুক্ত করল না, বরং দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত