প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ ও তুরস্ক আগামী বছরের শুরুতে ইসলামে নারীর অধিকার বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশের মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ এবং তুরস্কের সমাজকল্যাণমন্ত্রী মাহিনুর ওজদেমির গোকতার মধ্যে বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। বৈঠকে নারীর অধিকারকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশ্বের অভিজ্ঞতা বিনিময়, নীতি নির্ধারণ এবং সামাজিক অগ্রগতির জন্য যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
এই সম্মেলনে অংশ নেবেন বিশ্বজুড়ে শীর্ষস্থানীয় মুসলিম আলেম, গবেষক, সমাজবিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকরা। তাদের আলোচনায় উঠে আসবে ইসলামী মূল্যবোধে নারীর অধিকার ও মর্যাদার ঐতিহাসিক দিক, বর্তমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যে সব মুসলিমপ্রধান দেশ নারীর অধিকার রক্ষা ও অগ্রগতিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় মডেল হিসেবে তুলে ধরা হবে।
নারীর অধিকার নিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে অনেক বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশ ও তুরস্ক এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেখাতে চায় যে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েও আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নারীর অগ্রগতি সম্ভব। এ কারণে সম্মেলন শুধু একাডেমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নেও গুরুত্ব দেবে।
বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা নারীর সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সেবামূলক অর্থনীতি, সামাজিক সেবাখাত, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে নারী পরিচর্যাকর্মী তৈরির জন্য তুরস্কের সহায়তায় বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে নারীরা শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ জনশক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পাবেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশ ও তুরস্ক উভয় দেশই নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডও অনুমোদন করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। তবে বাস্তব প্রয়োগে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যা দূর করতে এই সম্মেলন কার্যকর হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
নারীর অধিকার নিয়ে মুসলিম সমাজে নানা ধরনের বিতর্ক এবং ভুল ধারণা বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামী আইনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে সীমিত করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ ইসলামের মূল শিক্ষায় নারীকে সম্মান, শিক্ষা গ্রহণ, সম্পদ ভোগ এবং সামাজিক নেতৃত্ব প্রদানের পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। এই সম্মেলনের আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরবেন কীভাবে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা মেনে আধুনিক সমাজে নারী তার পূর্ণ মর্যাদা লাভ করতে পারে।
নিউ ইয়র্কের বৈঠকে বাংলাদেশের মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিশ্বকে জানানোর সুযোগ এই সম্মেলন তৈরি করবে। তিনি উল্লেখ করেন, নারীর উন্নয়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গ্রামীণ অর্থনীতি, পোশাকশিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নারীর ভূমিকা দেশকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তুরস্কের সমাজকল্যাণমন্ত্রী মাহিনুর ওজদেমির গোকতার বলেন, মুসলিম বিশ্বের নারীরা একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। তাই অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং যৌথ সমাধানের পথে হাঁটলে মুসলিম সমাজের নারীরা বৈশ্বিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামের আলোকে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা শুধু সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য অপরিহার্য।
সম্মেলনের আরেকটি বিশেষ দিক হবে প্রযুক্তি ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ডিজিটাল সমাজে নারীর সক্রিয়তা বাড়ানো ছাড়া সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ এবং তুরস্কের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল এই বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যৌথ সম্মেলন মুসলিম সমাজে নারীর অধিকার নিয়ে যে বিভ্রান্তি রয়েছে তা দূর করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করা যায়, তার একটি কার্যকর রূপরেখা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও এই সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পাবে। শুধু নারী অধিকার নয়, সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম, শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ও আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতেও এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় চরমপন্থা ও লিঙ্গ বৈষম্যের অভিযোগে মুসলিম দেশগুলোকে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তবে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে সামনে এনে নারীর অধিকার নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিলে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মুসলিম দেশগুলোর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ ও তুরস্কের এই যৌথ সম্মেলন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং এটি মুসলিম বিশ্বের নারীর অধিকার, মর্যাদা ও অগ্রগতির জন্য এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে। ইসলামের আলোকে নারীর অবস্থান পুনর্নির্ধারণ এবং আধুনিক বাস্তবতায় তা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য এই সম্মেলনকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।