প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের বিনিয়োগ খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বহুদিন ধরে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে জটিলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগের পর এবার বিনিয়োগ সংস্থাগুলোর সব গভর্নিং বডি বিলুপ্ত করে একটি একক বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সরকারি সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করা, যাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সব ধরনের সেবা পেতে পারেন।
বর্তমানে দেশে একাধিক বিনিয়োগ সংস্থা থাকলেও, প্রতিটি সংস্থার আলাদা আলাদা গভর্নিং বোর্ড রয়েছে। এসব বোর্ডে অনেক ক্ষেত্রেই একই ধরনের প্রতিনিধি থাকেন, বিশেষ করে মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তবুও ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা বোর্ড মিটিং হয়, যা নিয়মিত নয় এবং অনেক সময় কয়েক বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়। যেমন—২০২০ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বোর্ড মিটিং হওয়ার পর প্রায় পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এত দীর্ঘ বিরতির কারণে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থবিরতা তৈরি হয়, যা বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
সরকারি সূত্র জানায়, নতুন উদ্যোগের আওতায় বিডা, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) একীভূত হয়ে একটি একক বোর্ডের অধীনে কাজ করবে। তবে বিসিকের সব কার্যক্রম এতে অন্তর্ভুক্ত হবে না। বিশেষ করে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একীভূতকরণ কমিটির প্রথম বৈঠকে বিসিককে সম্পূর্ণভাবে না রেখে এর আওতাধীন কিছু নির্দিষ্ট প্রকল্প, যেমন সাভারের চামড়া শিল্পনগরী ও কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট (সিইপিটি), নতুন কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন পায়।
প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ওই বৈঠকেই ৩০ এপ্রিল সরকার আট সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে, যেখানে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমানকে আহ্বায়ক এবং বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে সদস্য সচিব করা হয়। কমিটিতে আরও অন্তর্ভুক্ত হন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এবং অর্থ বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ খায়রুজ্জামান। এ কমিটিই মূলত নতুন সংস্থার কাঠামো, আইনগত সংশোধন এবং একীভূতকরণের রূপরেখা প্রণয়ন করবে।
তবে এ উদ্যোগ ঘিরে কিছু আপত্তিও উঠে এসেছে। বিশেষ করে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) বিনিয়োগ করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, তারা ইপিজেডের বিশেষ সুবিধা বিবেচনা করেই বিনিয়োগ করেছে, আর নতুন কাঠামোতে সেই সুবিধাগুলো ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, একীভূতকরণের ফলে বরং বিনিয়োগ সুবিধা আরও বাড়বে, কারণ এতে বিনিয়োগকারীদের আর একাধিক সংস্থায় ঘুরতে হবে না এবং সব সেবা একটি বোর্ড থেকেই পাওয়া যাবে।
বিডার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘমেয়াদে এ উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমাবে। অতীতে আলাদা আলাদা সংস্থা থাকার কারণে বিনিয়োগকারীদের একাধিক দরজা ঠকঠকাতে হয়েছে, অনেক সময় দ্বৈত সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়ার কারণে বিনিয়োগের গতি কমেছে। নতুন কাঠামোয় একটি বোর্ড বিনিয়োগ সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত নেবে, ফলে নীতিগত ধারাবাহিকতা থাকবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর দীর্ঘ বিরতি হবে না।
তবে এখনো বেশ কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। একীভূত সংস্থার নাম কী হবে, তার অর্গানোগ্রাম কেমন হবে, বিদ্যমান কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা ও চাকরির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এজন্য একটি বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নতুন সংস্থার কাঠামো এবং আইনগত প্রক্রিয়ার খসড়া তৈরি করবে। বেজার ‘প্রাইড’ প্রকল্পের আওতায় এ পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি।
একীভূত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রতিটি সংস্থা তাদের বিদ্যমান কাঠামো অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাবে। তবে নতুন কাঠামো কার্যকর হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক বার্তা যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সরলীকৃত ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চান। একাধিক সংস্থার জটিল কাঠামো তাদের নিরুৎসাহিত করে। একীভূতকরণের ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে।
এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। সরকার যদি কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং আস্থা নিশ্চিত করতে পারে, তবে এটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ খাতে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে গেলে বা স্বার্থান্বেষী মহলের চাপের কারণে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
সবশেষে বলা যায়, বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি কমানো এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে সরকারের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী। যদিও সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও একীভূতকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগ সংস্থাগুলোকে একটি বোর্ডে নিয়ে আসার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।