গাজার পথে ভেসে চলা ফ্লোটিলার একমাত্র নৌযান কোথায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫২ বার
বাংলাদেশ গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ওপর ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজার উদ্দেশে যাত্রা করা গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার বহরের একমাত্র অবশিষ্ট নৌযান ম্যারিনেট এখনো ভেসে চলছে ভূমধ্যসাগরের ঢেউ বেয়ে। অন্যান্য নৌযানগুলোকে ইসরাইলি বাহিনী আটক করলেও পোল্যান্ডের পতাকাবাহী এই ছোট্ট নৌযানটি প্রতীক হয়ে উঠেছে এক অদম্য যাত্রার, যেখানে ছয়জন যাত্রী জীবনবাজি রেখে এগিয়ে চলেছেন অবরুদ্ধ গাজার দিকে। শুক্রবার আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নৌযানটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছে এবং ঘণ্টায় প্রায় ৪ কিলোমিটার বেগে গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে। গাজার আঞ্চলিক জলসীমা থেকে এখনো প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে থাকলেও, নৌযানটির উপস্থিতি ফিলিস্তিন প্রশ্নে নতুন করে বিশ্বমঞ্চে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এই যাত্রাপথ মোটেও সহজ নয়। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে ম্যারিনেট-এর ক্যাপ্টেন জানান, ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যার কারণে সাময়িকভাবে নৌযানটির যাত্রা শ্লথ হয়ে পড়ে। তবে তা মেরামত করা সম্ভব হয়েছে এবং এখন এটি স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে চলছে। ফ্লোটিলার আয়োজকরা নিশ্চিত করেছেন, নৌযানটি এখনো স্টারলিংকের মাধ্যমে সংযুক্ত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। এমনকি লাইভ স্ট্রিমও চালু আছে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে সরাসরি এই যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করছে।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ম্যারিনেট কেবল একটি নৌযান নয়; এটি প্রতিরোধ, সাহস এবং মানবিক সংহতির প্রতীক। ইসরাইলি নৌবাহিনী ইতিমধ্যেই অন্যান্য নৌযান আটক করেছে, তবু এই একটি নৌযান ভেসে চলেছে অবিচলভাবে। আয়োজকরা বলেছেন, “ম্যারিনেট ফিরে যাবে না। এটি ভয়, অবরোধ ও বর্বরতার মুখে অবিচল থাকার প্রতীক। গাজা একা নয়, ফিলিস্তিনকে কেউ ভুলে যায়নি।

এই বক্তব্য শুধু একটি নৌযানের সীমিত বার্তা নয়; বরং এটি গোটা আন্দোলনের প্রতিফলন। গাজার অবরোধ, ইসরাইলি সামরিক তৎপরতা ও মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ এটি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নৌযান নিয়ে আসা মানুষগুলো দেখিয়ে দিয়েছেন, ফিলিস্তিন প্রশ্ন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়, বরং এটি বিশ্বমানবতার প্রশ্ন।

গ্লোবাল ফ্লোটিলা ট্র্যাকার জানিয়েছে, এই অভিযানে মোট ৪৪টি নৌযান অংশ নিয়েছিল। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে কর্মী, মানবাধিকারকর্মী, শিল্পী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যোগ দিয়েছিলেন এতে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সুইডেনের খ্যাতিমান জলবায়ু ও অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্পী শহিদুল আলম এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি এনকোসি জেলিভেলিল ম্যান্ডেলা। তাদের এই উপস্থিতি অভিযাত্রাটিকে দিয়েছে বৈশ্বিক মাত্রা এবং নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।

প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এতগুলো নৌযানকে আটক করা গেল অথচ একটি নৌযান এখনো ভেসে চলছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলি বাহিনী নৌযানগুলোর অবস্থান শনাক্ত করে সেগুলো আটক করলেও ম্যারিনেট ছোট আকারের হওয়ায় এবং গতিপথ কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় এখনো আটকানো সম্ভব হয়নি। তবে গাজার কাছাকাছি পৌঁছালে সেটিও আটকানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ফ্লোটিলার মূল লক্ষ্য ছিল গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে অবরোধে থাকা গাজা এখন এক গভীর মানবিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঘাটতি তীব্র আকার নিয়েছে। জাতিসংঘ বারবার বলেছে, গাজার পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও অবরোধ প্রত্যাহার করেনি ইসরাইল। এই পরিস্থিতিতে ফ্লোটিলার যাত্রা মানবিক সংহতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একাংশ ফ্লোটিলার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মানববন্ধন, সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংহতির বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। আবার অনেক পশ্চিমা দেশ ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে নীরব থেকেছে। তবে এতটুকু স্পষ্ট, ম্যারিনেট-এর প্রতিটি পদক্ষেপ এখন বিশ্ব গণমাধ্যমের নজরে।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ম্যারিনেট যদি গাজার আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ করে, তবে ইসরাইলি বাহিনীর বাধার মুখে পড়বে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে, যখন গাজাগামী ত্রাণবাহী নৌযানগুলোকে আটক বা আক্রমণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই ইসরাইলকে সতর্ক করেছে যেন কোনো ধরনের সহিংস পদক্ষেপ নেওয়া না হয়। তবে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তা নির্ভর করছে আসন্ন কয়েক ঘণ্টা ও দিনের ওপর।

সবশেষে বলা যায়, ম্যারিনেট এখন শুধু একটি নৌযানের নাম নয়, বরং এটি প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি। যারা এর ভেতরে আছেন, তারা কেবল গাজায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে চাচ্ছেন না; বরং তারা বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন—ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখনো জীবন্ত, গাজা এখনো মানবিক সহায়তার অপেক্ষায়, আর মানুষ এখনো প্রতিবাদের নৌকা ভাসাতে জানে।

এই ছোট্ট নৌযানের ভেসে চলা যেন প্রমাণ করছে, রাষ্ট্রযন্ত্র যত শক্তিশালী হোক না কেন, মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো কয়েকজন মানুষও বিশ্বের বিবেককে নাড়া দিতে পারে। গাজার উদ্দেশে এগিয়ে চলা এই যাত্রা তাই কেবল ভূগোলের সীমানা নয়, বরং ন্যায় ও মানবতার সংগ্রামের সীমানাকেও অতিক্রম করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত