প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ত্রাণ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এরই মধ্যে গাজায় পৌঁছাতে যাওয়া গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার শেষ নৌযানটিও ইসরাইলি সেনারা আটক করেছে। শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে সরাসরি সম্প্রচারিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, ইসরাইলি কমান্ডোরা জাহাজে প্রবেশ করে এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর আগে বৃহস্পতিবার ইসরাইল ঘোষণা করেছিল যে ফ্লোটিলার একটি ছাড়া সবগুলো জাহাজ তারা আটক করেছে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার সেই শেষ জাহাজটিও ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এই ঘটনার মধ্যেই ফিলিস্তিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর জোট ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) নতুন করে গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। শুক্রবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, ইতালি ও ফ্রান্সের পতাকাবাহী দুটি নৌযান ইতালির ওৎরান্তো বন্দর থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর গাজার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর আরও নয়টি নৌযান যুক্ত হয়। এগুলো একত্র হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বহর হিসেবে অগ্রসর হবে।
এফএফসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন বহরের মোট ১১টি নৌযানে প্রায় ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক ও নাবিক রয়েছেন। বহরের সঙ্গে খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তা পাঠানো হচ্ছে। এই বহরের যাত্রা আন্তর্জাতিক মানবিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংগঠনটির সদস্যরা আশা করছেন, আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান জানিয়ে এই বহরকে আটক করবে না ইসরাইল, যদিও পূর্ব অভিজ্ঞতা ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
এফএফসি গঠিত হয় ২০০৮ সালে। শুরু থেকেই এ জোট মানবিক সহযোগিতা পাঠানোর নামে বহুবার গাজায় ফ্লোটিলা পাঠিয়েছে। এই জোটের প্রধান চার সংগঠন হলো ফ্রিডম ফ্লোটিলা ফাউন্ডেশন, গ্লোবাল মুভমেন্ট টু গাজা, মাগরেব সুমুদ ফ্লোটিলা এবং সুমুদ নুসানতারা। গত ১৭ বছরে তারা বারবার গাজার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। গত আগস্ট মাসেও এই জোট ৪৩টি নৌযানে খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর উদ্যোগ নেয়, যা নামকরণ করা হয় ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’। সেই বহরে ৪৪টি দেশের ৫০০ জন নাগরিক অংশ নেন, যাদের মধ্যে ছিলেন সুইডেনের আন্তর্জাতিক পরিবেশ আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি মান্ডলা ম্যান্ডেলা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্য, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা।
৩১ আগস্ট স্পেনের বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল এই গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা। গাজার জলসীমার কাছাকাছি পৌঁছালে ইসরাইলি নৌবাহিনী একটি ছাড়া সবগুলো জাহাজ আটক করে। শুক্রবার যে শেষ জাহাজটিও আটক হলো, তাতে অনেকের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক সাগরপথে মানবিক ত্রাণবাহী নৌযান আটক করার বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে।
ইসরাইলের দাবি, এসব জাহাজে কেবল ত্রাণ নয়, বরং গাজায় বিদ্রোহ উস্কে দেওয়ার মতো উপকরণ ও রাজনৈতিক প্রচারণার সামগ্রী বহন করা হয়। অন্যদিকে এফএফসি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ফ্লোটিলাগুলোতে শুধুই চিকিৎসা সামগ্রী, খাদ্য এবং গৃহহীন ও আহত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠানো হয়। এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলি বাহিনীর এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানবিক সংকট আরও তীব্র করছে।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ জরুরি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ সংকট এবং জ্বালানির অভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া গাজার মানুষের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
নতুন করে যাত্রা শুরু করা ফ্লোটিলা আবারও গাজা উপত্যকায় আশা জাগাচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রতিবার বাধা সত্ত্বেও নতুন নতুন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজার মানুষের পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছে। তবে এর সফলতা কতটা হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ইসরাইলের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক চাপের ওপর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজা ইস্যু শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক সংকটও বটে। ইসরাইলের দখলনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দুর্বল প্রতিক্রিয়া একে আরও জটিল করে তুলেছে। মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজগুলো আটক করার মাধ্যমে ইসরাইল বিশ্ব সম্প্রদায়কে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, গাজার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অটল থাকবে। অন্যদিকে ফ্লোটিলা উদ্যোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখনও ন্যায় ও মানবাধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার।
এফএফসি-র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা যেকোনো বাধা অতিক্রম করে গাজার মানুষের পাশে থাকবে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নতুন করে প্রশ্ন উঠে এসেছে—মানবাধিকার রক্ষায় বিশ্ব কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।