বৃষ্টির ভেতরেও কুয়ালালামপুরে গাজা সংহতিতে জনতার ঢল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১৯ বার
সংক্ষিপ্ত শিরোনাম: বৃষ্টির ভেতরেও কুয়ালালামপুরে গাজা সংহতিতে জনতার ঢল

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে শুক্রবার অনুষ্ঠিত ইসরাইলবিরোধী সমাবেশ প্রমাণ করেছে যে গাজার মানুষের দুর্দশা এখনো বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ের কেন্দ্রে। ভোর থেকে আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর টানা বৃষ্টির মধ্যেও হাজারো মানুষ সমাবেশে যোগ দিতে রাজধানীর তাবুং হাজি ভবনের সামনে জড়ো হন। জুমার নামাজ শেষে বিশিষ্ট বক্তাদের বক্তব্যের পর জনতা বিক্ষোভ মিছিলের আকারে মার্কিন দূতাবাসের দিকে অগ্রসর হয়। পথে পথে তারা স্লোগানে মুখরিত হয়ে গাজার মানুষদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এবং ইসরাইলি আগ্রাসনের কঠোর নিন্দা জানায়।

সমাবেশে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিমের বার্তা। তিনি গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা (জিএসএফ) অভিযানের কথা উল্লেখ করে এটিকে সীমাহীন মানবতার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। খাদ্য ও ওষুধ বহনকারী স্বেচ্ছাসেবীদের আটক করার ঘটনা তিনি মানবিক নীতির পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন। তার বক্তব্য জনতার মাঝে গভীর প্রভাব ফেলে, যেখানে মানবতার প্রশ্নে মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ অবস্থান দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমাবেশ কেবল একটি প্রতিবাদ সমাবেশ নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা, যা বিশ্বকে জানিয়ে দিচ্ছে যে মালয়েশিয়া ফিলিস্তিন প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। মালয়েশিয়ার জনগণ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। তবে এবার পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সম্প্রতি গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নৌযানগুলো আটক করে ইসরাইল, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

মালয়েশিয়ার সরকারের ভূমিকা কেবল সড়ক-সমাবেশে সীমিত নয়। দেশটি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও সক্রিয় রয়েছে। মালয়েশিয়া বারবার জাতিসংঘে গাজা ইস্যুতে ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি দেশটিকে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই ভারসাম্য রক্ষা একদিকে গাজার মানুষের পক্ষে সমর্থন, অন্যদিকে বৈশ্বিক কূটনীতিতে মালয়েশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে তুলে ধরে।

সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে যে গাজা ইস্যুতে নীরব থাকা মানে অন্যায়ের অংশীদার হওয়া। জনতার দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব যদি কার্যকরভাবে গাজার পাশে না দাঁড়ায় তবে তারা ইতিহাসের কঠোর বিচারের মুখে পড়বে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়াও প্রকাশ্যে ফ্লোটিলা অভিযানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজার মানবিক সংকটের সময় নীরব থাকা মানে অন্যায়ের সঙ্গী হওয়া। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং বাস্তব জটিলতার কারণে তারা সরাসরি ফ্লোটিলা মিশনে অংশ নিতে পারেনি। তবুও রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন তারা অব্যাহত রেখেছে।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও কাতারের অবস্থান বিশ্ব মুসলিম জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। এই দেশগুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে, ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের জনমনে এক ধরনের ঐক্য রয়েছে। বিশেষ করে ফ্লোটিলা আন্দোলনকে ঘিরে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে গড়ে ওঠা ঐক্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো ইসরাইলের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি উপেক্ষা করছে। ইউরোপের অনেক দেশও প্রকাশ্যে মানবিক সহায়তার কথা বললেও বাস্তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থে তারা ইসরাইলকে চাপ দিতে আগ্রহী নয়। এই অবস্থান ফ্লোটিলা আন্দোলনকে বৈশ্বিক কূটনীতিতে কাঙ্ক্ষিত শক্তি এনে দিতে পারছে না।

এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষরা বলছেন, গাজার মানুষের প্রতি সংহতি জানানো শুধু একটি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি মানবতার প্রশ্ন। তারা মনে করেন, যেভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন বৈশ্বিক জনমত গড়ে তুলেছিল, ঠিক তেমনি গাজার ইস্যুতেও জনমত জাগিয়ে তুলতে হবে।

মালয়েশিয়ার রাস্তায় টানা বৃষ্টির মধ্যেও মানুষের ঢল প্রমাণ করে দিয়েছে, গাজা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংকট নয়, বরং এটি বৈশ্বিক মানবাধিকার আন্দোলনের একটি অংশে পরিণত হয়েছে। রাজা সুলতান ইব্রাহিমের বার্তাও এই সমাবেশে বিশেষ তাৎপর্য এনে দিয়েছে, যেখানে মানবিকতার প্রশ্নে শাসক ও জনগণ একই কণ্ঠে কথা বলছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফ্লোটিলা আন্দোলন এবং মুসলিম বিশ্বের ক্রমবর্ধমান ঐক্য কি পশ্চিমা দুনিয়ার নীতিকে প্রভাবিত করতে পারবে? নাকি এটি আবারও কেবল মানবিক আবেগের প্রকাশেই সীমিত থেকে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত