প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভাষা সৈনিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও রবীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিকের মৃত্যুতে গোটা জাতি আজ শোকাহত। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের একজন অগ্রণী সাক্ষী, সংগ্রামী কণ্ঠস্বর এবং বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির নিবেদিত প্রাণ। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১২ মিনিটে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এক শোকবার্তায় বলেন, আহমদ রফিক শুধু ভাষা আন্দোলনেরই নয়, তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার এক বাতিঘর, বাংলা সাহিত্যের অনন্য রূপকার এবং রবীন্দ্রচর্চার নিরলস পথিকৃৎ। তিনি তার শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার জীবন ও কর্ম শুধু বর্তমান প্রজন্মকেই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও অনুপ্রেরণা জোগাবে।
আহমদ রফিক ১৯২৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই সাহিত্য, গবেষণা ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি বাংলা ভাষার মর্যাদা ও জাতীয় সংস্কৃতির স্বকীয়তা রক্ষায় ছিলেন অটল। তার কলমে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যেমন নথিভুক্ত হয়েছে, তেমনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা ধারা পেয়েছে নতুন মাত্রা।
বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে তার অবদান বহুমুখী। তিনি শুধু কবিতাই লেখেননি, বরং প্রবন্ধ, গবেষণা, সম্পাদনা এবং সাহিত্য সমালোচনা সব ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন এক অমূল্য ভাণ্ডার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে তার গভীর অনুসন্ধান তাকে দুই বাংলার সমান শ্রদ্ধা এনে দিয়েছে। কলকাতার টেগর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাকে “রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য” উপাধিতে ভূষিত করে, যা তার বিদগ্ধতা ও রবীন্দ্রচর্চায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি বহন করে।
তার প্রাপ্তির তালিকাও দীর্ঘ। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা তিনি অর্জন করেছেন। তবে তার প্রকৃত স্বীকৃতি ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। তিনি ছিলেন একজন মুক্তচিন্তার সৈনিক, যিনি সারাজীবন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছেন।
শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে গেছেন। কিডনির জটিলতা ও একাধিকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
তার মৃত্যুতে গোটা সাহিত্যাঙ্গন ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা বলেছেন, আহমদ রফিক ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যার আলোয় নতুন প্রজন্ম তাদের পথ খুঁজে পেত। তার প্রয়াণে শুধু একটি পরিবারই নয়, হারালো সমগ্র জাতি।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে আহমদ রফিকের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন ১৯৫২ সালের আন্দোলনের এক অগ্রণী যোদ্ধা, যিনি শুধু রাস্তায় নয়, কলমের মাধ্যমেও বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। তার লেখা ও গবেষণা আজও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানতে আগ্রহী গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে অমূল্য সম্পদ।
জাতীয় জীবনে তার অবদান অমোচনীয়। বাংলাদেশের মানুষ আজ তার শূন্যতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করছে। তবে তার রচনা, কর্ম ও আদর্শ আজও জীবন্ত। তিনি আমাদের জাতিসত্ত্বার সঙ্গে মিশে আছেন, থাকবেনও অনন্তকাল।
প্রধান উপদেষ্টা শোকবার্তায় উল্লেখ করেন, “আহমদ রফিকের প্রয়াণ দেশের সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ আলোকবর্তিকা, যিনি শেষ দিন পর্যন্ত সত্যের পক্ষে কলম ধরেছেন।”
তার পরিবার, শুভানুধ্যায়ী ও ভক্তদের প্রতি জাতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। তার প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যের যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে এই মহান ভাষা সৈনিককে স্মরণ করছে। তার জীবন সংগ্রাম, সাহিত্যকীর্তি ও রবীন্দ্র গবেষণা আগামী দিনের প্রজন্মকে প্রেরণা যোগাবে। আহমদ রফিকের নাম ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।