শহিদুল আলমের ভাগ্যে কি আছে আটক হলেন ইসরাইলের হাতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৩ বার
শহিদুল আলমের ভাগ্যে কি আছে আটক হলেন ইসরাইলের হাতে

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে আলোচিত নাম শহিদুল আলম। বাংলাদেশের এই প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী আবারও বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছেন, তবে এবার এক নাটকীয় ও উদ্বেগজনক ঘটনায়—ইসরাইল কর্তৃপক্ষের হাতে তার আটক হওয়ায়। বুধবার স্থানীয় সময় সকাল নাগাদ জেরুজালেমে তাকে আটক করে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে জানা যায়, শহিদুল আলম একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলনে অংশ নিতে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তিনি গাজা উপত্যকায় চলমান মানবিক বিপর্যয়, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি, শহিদুল আলম “অননুমোদিত এলাকায় প্রবেশ” ও “নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন” করেছেন, তবে তার সহকর্মীরা বলছেন, তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে যে তারা ইসরাইল সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। যেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় না এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তাই শহিদুল আলমের আটক ইস্যু কূটনৈতিকভাবে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহিদুল আলমকে জেরুজালেমের একটি নিরাপত্তা হেফাজত কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ ঘোষণা না করলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, এটি হয়তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরেকটি আঘাত।

শহিদুল আলমের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার সকাল পর্যন্ত তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। তার স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে লিখেছেন, “শহিদুলের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শান্তিকর্মী ও মানবাধিকার রক্ষাকারী। তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও দ্রুত প্রতিক্রিয়া আসে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা শহিদুল আলমের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে জানায়, “শহিদুল আলম সত্য বলার কারণে বারবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। ইসরাইলের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।”

শহিদুল আলম দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে কাজ করে আসছেন। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সরকারবিরোধী মন্তব্যের কারণে তাকেও ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তিনি মুক্তি পান। তিনি “ড্রিক গ্যালারি” ও “পাঠশালা” নামের দুটি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যা আলোকচিত্রের মাধ্যমে সমাজের প্রান্তিক কণ্ঠগুলোকে তুলে ধরে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শহিদুল আলমের মতো একজন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীর ইসরাইলি হেফাজতে যাওয়া নিছক প্রশাসনিক ঘটনা নয়; বরং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার ইস্যুতে বৈশ্বিক উত্তেজনারই প্রতিফলন। কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা এবং সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মীর আটক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য নতুন এক রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলে দিল।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা শহিদুল আলমের গ্রেফতার সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য চাইবে এবং এ বিষয়ে ইসরাইলের সঙ্গে যোগাযোগে আছে। তিনি বলেন, “যে কেউ মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করেন, তাকে হুমকি বা ভয় দেখিয়ে থামানো মানবতার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।”

এদিকে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিক মহলেও এ ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, শহিদুল আলম বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মানবাধিকারের এক অনন্য প্রতীক। তার আটক দেশটির ভাবমূর্তিতে আঘাত হানছে এবং বাংলাদেশ সরকারের উচিত দ্রুত আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তোলা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরাইলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ না থাকায়, এই ঘটনাটি বাংলাদেশের নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ বা তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের সহায়তা নেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প পথ নেই।

ঢাকা থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, শহিদুল আলমের মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মানবাধিকারকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #FreeShahidulAlam হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত শহিদুলের আটক সংক্রান্ত কোনো ভিডিও বা ছবি প্রকাশ করেনি, যা ঘটনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, “যদি শহিদুল আলম কেবলমাত্র মানবিক পর্যবেক্ষক হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকেন, তাহলে তার আটক সম্পূর্ণ বেআইনি ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।”

বাংলাদেশি নাগরিকদের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “যিনি আজীবন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কাজ করেছেন, তাকে কারাগারে নয়, সম্মানে রাখা উচিত।”

সবশেষে বলা যায়, শহিদুল আলমের আটক কেবল একজন ব্যক্তির ঘটনা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকারের মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতার প্রতীক। বিশ্ব যখন মানবাধিকারের নামে রাজনৈতিক কূটকৌশল চালাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের একজন নাগরিকের এই আটকের ঘটনাটি সেই নৈতিকতার প্রশ্নকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরিণতি কী দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়—শহিদুল আলম মুক্তি পাবেন, না তিনি আরও একবার বৈশ্বিক রাজনীতির বলির পাঁঠা হবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত