ফিলিস্তিন -আলোচনা অব্যাহত হামাস দিলেন বন্দি তালিকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৮ বার
ফিলিস্তিন -আলোচনা অব্যাহত হামাস দিলেন বন্দি তালিকা

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে চলমান আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে হামাস। সংগঠনটি জানিয়েছে, ইসরাইলি জিম্মিদের বিনিময়ে যেসব ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি চায়, তাদের একটি বিস্তারিত তালিকা মিশরের মধ্যস্থতায় আলোচনার টেবিলে জমা দিয়েছে। হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাহের নুনু এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, গাজা উপত্যকায় স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে, যদিও মূল ইস্যুগুলিতে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহের নুনু বর্তমানে মিশরের শার্ম আল-শেখে অবস্থান করছেন, যেখানে দ্বিতীয় দিনের মতো হামাস ও ইসরাইলের প্রতিনিধিদের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার পরিসর বাড়ানো হয়েছে। এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময় এবং ইসরাইলি বাহিনীর গাজা থেকে পূর্ণ প্রত্যাহার। হামাস তাদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করেছে, কোনো ধরনের সামরিক উপস্থিতি কিংবা নিয়ন্ত্রণ থাকলে স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।

এক বিবৃতিতে তাহের নুনু বলেন, “আমরা আলোচনায় মূলত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি—গাজা যুদ্ধের পূর্ণ অবসান এবং উপত্যকা থেকে ইসরাইলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। মধ্যস্থতাকারীরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পথে সব বাধা দূর করতে। এখন আলোচনাকারীদের মধ্যে আশাবাদী মনোভাব তৈরি হয়েছে।”

সূত্র জানায়, মিশরের নেতৃত্বে এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও তুরস্ক পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে গভীর আলোচনা চলছে। এই পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন, মানবিক সাহায্যের অবাধ প্রবাহ ও বন্দি বিনিময়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনারও বুধবার আলোচনায় যোগ দেন। কুশনার এর আগে “আব্রাহাম চুক্তি”র সময় মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এবারও তার উপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।

বিবিসি ও রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আলোচনার প্রথম দুই দিন তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও উভয় পক্ষ এখন সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “এটি একটি জটিল ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। উভয় পক্ষের আস্থা অর্জন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

হামাসের দাবি, ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক আগ্রাসন ও গাজার অবরোধ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। সংগঠনটি জানায়, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের নীতি পরিবর্তন না হলে কোনো ধরনের স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। তারা আরও দাবি করেছে, ইসরাইলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে, এবং তাদের মুক্তিই আলোচনার অন্যতম শর্ত।

ইসরাইলি পক্ষ অবশ্য এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, বন্দি বিনিময়ের আগে হামাসকে গাজার রকেট হামলা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মেনে নিতে হবে। ইসরাইলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বলেন, “আমরা শান্তি চাই, কিন্তু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো চুক্তি কার্যকর করা সম্ভব নয়।”

অন্যদিকে, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি ও তুরস্কের গোয়েন্দা প্রধানও এই আলোচনায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কূটনৈতিক ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কাতার ও তুরস্কের অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দেয়, হামাসের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে যেন তারা রাজনৈতিক সমাধানের পথে আসে।

মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, আলোচনায় অগ্রগতি না হলেও, উভয় পক্ষই শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হামাসের বন্দি বিনিময় তালিকা দেওয়া একটি বড় পদক্ষেপ। কারণ এর মাধ্যমে তারা আলোচনায় অংশগ্রহণের বাস্তব আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে ইসরাইলি সরকার এখনো নিশ্চিত নয় হামাসের দাবির তালিকা কতটা বাস্তবসম্মত। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, হামাস যেসব বন্দিকে মুক্তি চায়, তাদের অনেকেই দীর্ঘ মেয়াদী দণ্ডপ্রাপ্ত, এবং তাদের মুক্তি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনাকে মধ্যপ্রাচ্যে “নতুন কূটনৈতিক সুযোগ” হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন, “আমরা এমন একটি মধ্যপন্থা খুঁজছি, যা ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ফিলিস্তিনিদেরও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার দেবে।”

তবে প্রশ্ন থেকে গেছে—ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা কি বাস্তবায়নযোগ্য? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অতীতের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত উভয় পক্ষ পরস্পরের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে একচুলও সরতে না চায়, ততক্ষণ কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না। তবুও আলোচনায় হামাসের বন্দি বিনিময় তালিকা জমা দেওয়া এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

গাজার সাধারণ মানুষ এই আলোচনার ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা চায় যুদ্ধের অবসান, নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার নিশ্চয়তা। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষ এখন একটিই প্রত্যাশা করছে—কোনো এক সকালে যেন তারা আর বিমান হামলার শব্দে ঘুম থেকে না জাগে, বরং শিশুরা ফিরে পায় তাদের স্কুল, পরিবার ফিরে পায় শান্তির জীবন।

মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মিশরের আলোচনাটিকে অনেকেই ‘শেষ আলো’ হিসেবে দেখছেন। হামাসের নতুন প্রস্তাব, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ হয়তো গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ সুগম করতে পারে—যদি উভয় পক্ষ এখনই সংযম ও সমঝোতার পথ বেছে নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত