প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে আগামী বুধবার, যখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ সই হবে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। বিকেল ৩টায় আয়োজিত এ ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেবেন বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের ঐকমত্য কমিশনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সনদ স্বাক্ষরের এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। কমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায়, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়। কমিশন আশা প্রকাশ করেছে, সংগৃহীত মতামতের ভিত্তিতে খুব শিগগিরই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি সংক্রান্ত সুপারিশ সরকারকে জমা দেওয়া হবে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও ড. মো. আইয়ুব মিয়া। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারও বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে কমিশনের সদস্যরা উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে তিন দফায় সংলাপ সম্পন্ন করেছে। এই সংলাপের ফলাফল ও দলগুলোর অভিন্ন মতের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫”। তবে সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো কিছু মতভেদ বিদ্যমান। বিশেষ করে সনদ বাস্তবায়নের গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যদিও গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন।
এদিকে নির্বাচন কমিশনও সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করলে ব্যয় কমবে এবং সময়ও সাশ্রয় হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এমন পর্যায়ে আছে যে, একই দিনে দুই ভোট গ্রহণ করা সম্ভব।” তিনি আরও জানান, “ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ কিছু বাড়ানো লাগতে পারে, তবে এতে আইনি কোনো বাধা নেই।”
কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে প্যাকেজ সুপারিশের চেয়ে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। শুরুতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের পরামর্শে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে কমিশন সদস্যরা ‘প্রতীকী ঐক্যের প্রতিফলন’ হিসেবে দেখছেন।
কমিশনের পক্ষ থেকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটকে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিটি দলকে দুইজন করে প্রতিনিধির নাম পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে, যার অধিকাংশই ইতিমধ্যে নাম জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
ঐকমত্য কমিশনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’। অনুষ্ঠানে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ প্রতিটি বড় দল থেকে অন্তত ৩০ জন করে নেতা উপস্থিত থাকবেন। ছোট দলগুলো থেকেও প্রায় ১০ জন করে প্রতিনিধি যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, “সব দলের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে, তারা ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি এমনভাবে আয়োজন করা হবে যাতে এটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।” তিনি আরও বলেন, “দলের প্রতিনিধি ছাড়াও শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদেরও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হবে, যাতে দেশের সব রাজনৈতিক পক্ষের উপস্থিতিতে এই সনদ স্বাক্ষর এক ঐতিহাসিক রূপ নেয়।”
আগামী শনিবার ঐকমত্য কমিশনের আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের বিস্তারিত কার্যক্রম ও অংশগ্রহণকারী দলগুলোর চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদিত হবে।
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা করতে যাচ্ছে। জুলাই জাতীয় সনদ সইয়ের মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্যের যে স্বপ্ন বহুদিন ধরে আলোচিত, তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁরা বলছেন, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি হতে পারে জাতির পুনর্গঠনের এক নতুন ভিত্তিপ্রস্তর।