প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
”ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা মানবিক কারণে এই পদক্ষেপ নিয়েছি। তবে আমাদের দেশের নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো আপস হবে না।” তিনি আরও জানান, জিম্মিদের মুক্তির পরও গাজায় সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিনের সংঘাত ও রক্তপাতের পর অবশেষে এক মানবিক প্রক্রিয়ার সূচনা হলো—হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে বন্দি বিনিময় শুরু হয়েছে। এই বিনিময় কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্যের টানটান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এক আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে। আল জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামাস তাদের হাতে আটক ২০ ইসরাইলি জিম্মিকে মুক্তি দিচ্ছে, বিনিময়ে ইসরাইলও মুক্ত করছে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে।
এই মুক্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই উভয় পক্ষের সীমান্ত অঞ্চলে স্বজনদের ভিড় উপচে পড়েছে। কেউ প্রিয়জনের জীবিত ফেরার অপেক্ষায় কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কেউ আবার অবিশ্বাস আর স্বস্তির মিশ্র আবেগে অপেক্ষা করছেন। দক্ষিণ ইসরাইলের সীমান্ত শহরগুলোর আশপাশে শত শত মানুষ জড়ো হয়েছেন তাদের প্রিয়জনদের এক ঝলক দেখার আশায়। একইভাবে গাজার খান ইউনিস ও রাফাহ এলাকার পরিবারগুলোও চোখ রেখেছে সীমান্তের দিকে—বহু বছর পর হয়তো তারা তাদের প্রিয়জনকে ফিরে পেতে পারেন।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রিসেন্ট (ICRC) নিশ্চিত করেছে যে তারা এই বন্দি বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তি নিশ্চিত করতে একটি বহু-পর্যায়ের অভিযান শুরু হয়েছে। আজ প্রথম পর্যায়ে সাত ইসরাইলি জিম্মিকে রেড ক্রিসেন্টের তত্ত্বাবধানে মুক্ত করা হচ্ছে। বাকি জিম্মিদের ধাপে ধাপে মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, “আমাদের নাগরিকদের নিরাপদে ঘরে ফেরাতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখছি। এই মুক্তি কার্যক্রম কূটনৈতিক ও মানবিক প্রচেষ্টার ফল।” অন্যদিকে হামাসের এক মুখপাত্র বলেন, “এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং এটি একটি মানবিক উদ্যোগ। ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বন্দি বিনিময়কে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যদিও স্থায়ী শান্তি এখনো অনেক দূরের বিষয়। একদিকে ইসরাইলি পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনদের ফেরার অপেক্ষায়, অন্যদিকে ফিলিস্তিনের বন্দিশালা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় অনেকেই নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন।
ইসরাইলি সমাজে এখন এক অদ্ভুত মিশ্র আবেগের সঞ্চার হয়েছে। একদিকে জিম্মিদের নিরাপদে ফেরার আনন্দ, অন্যদিকে আশঙ্কা—এই বিনিময় কি নতুন করে সহিংসতার জন্ম দেবে? অন্যদিকে গাজা শহরে এবং পশ্চিম তীরে উদযাপনের আবহ। বন্দিদের স্বজনরা রাস্তায় নেমে আসছেন, পতাকা উড়াচ্ছেন, দোয়া করছেন। অনেক পরিবার বহু বছর পর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আবেগে ভাসছে। কিছু বন্দির পরিবারের সদস্য জানালেন, তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে দীর্ঘদিন পর আবার তারা একসঙ্গে হতে চলেছেন। এক বৃদ্ধা মা, যিনি ছেলেকে ১০ বছর আগে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে হারিয়েছিলেন, বললেন, “আমি ভেবেছিলাম, আমি মরার আগ পর্যন্ত ছেলেকে দেখতে পাব না। আজ আমার সেই প্রার্থনা পূরণ হচ্ছে।”
বন্দি বিনিময়ের এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি মানবিক সংলাপের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন মন্তব্য করেছেন, “বন্দি বিনিময় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, মূল সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তি অসম্ভব।”
গাজার মানবিক পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ। বিদ্যুৎ, পানি, ওষুধ এবং খাদ্য সংকটে বহু মানুষ জীবনযুদ্ধে লড়ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বন্দি বিনিময় ছাড়াও এখন প্রয়োজন ব্যাপক মানবিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি।
তবে এই বিনিময় অনেকের জন্য এক টুকরো আশার আলো হয়ে এসেছে। এটি শুধু বন্দি মুক্তির ঘটনা নয়, বরং হাজারো পরিবারের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। হয়তো এই মুক্তির দৃশ্যগুলো একদিন ইতিহাসে পরিণত হবে—যেদিন সংঘাতের অন্ধকারে মানবতার আলো প্রথমবারের মতো দেখা দিয়েছিল।
গাজা ও ইসরাইলের সীমান্তে তাই এখন কাঁটাতারের দুই পাশে একই দৃশ্য—অপেক্ষা, চোখের জল, ভালোবাসা আর আশার আলো। কেউ মুক্তির আনন্দে ভাসছে, কেউ প্রার্থনায় নিমগ্ন। ইতিহাসের এই পর্বে মানবিকতার জয় হোক, এই প্রার্থনাই এখন দুই জাতির সাধারণ মানুষের।