রাজধানীর হাতিরঝিল থানার অস্ত্র আইনের মামলায় দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে মো. ফাতেহ আলী এবং তার তিন সহযোগীর বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থেকে আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫-এর বিচারক ফাহমিদা জাহাঙ্গীর আদালতে শুনানি শেষে চার্জ গঠন করেন। মামলার পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কারাগার থেকে সুব্রত বাইন ও আরাফাতকে আদালতে হাজির করা হয়, যখন অন্য দুই আসামি মোল্লা মাসুদ ও এস এম শরীফকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে শুনানিতে যুক্ত করা হয়। উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপনার পর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১৬ নভেম্বর দিন ধার্য করেন।
মামলার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, গত ২৭ মে ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ অভিযান কুষ্টিয়া থেকে সুব্রত বাইন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে আরাফাত ও এস এম শরীফকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫৩টি গুলি এবং একটি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ২০০১ সালে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুব্রত বাইন ও তার সহযোগী মোল্লা মাসুদসহ ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ঘোষণা করে এবং তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। তারা সেভেন স্টার গ্রুপ নামে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করতো। সুব্রত বাইন দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য খুন ও ডাকাতি সংঘটনের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং পরে ভারত পালিয়ে যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সে দেশে প্রবেশ করে পুনরায় খুন ও চাঁদাবাজি শুরু করে। তার সহযোগী এস এম শরীফের হাতিরঝিলের বাড়িতে নিয়মিত মিটিং করত তারা, যেখানে তাদের ব্যবহৃত অস্ত্র, গুলি ও অপরাধ সংগঠনের বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখা ছিল। একই বছরের ১৩ জুলাই চারজনকে অভিযুক্ত করে ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
বিচার শুরু হওয়া এই মামলায় আসামি পক্ষের আইনজীবীরা তাদের অব্যাহতির আবেদন করেন, যা আদালত নাকচ করে দেয়। মামলার সরকারি তর্কে প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। এ মাধ্যমে সুব্রত বাইন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের ভুয়া-হাতিয়ার দায় স্বীকার বা প্রমাণিত হলে শাস্তির পথে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো।
মামলার শুরুতে আদালতে উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত সুব্রত বাইন এবং তার সহযোগী আরাফাত। গ্রেপ্তার হওয়া সময় থেকেই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের রয়েছে। ঢাকার মহানগর আদালত সূত্রে জানা গেছে, সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হলে আরও বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হবে।
এই মামলার গুরুত্ব দেশের নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাস দমন নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০০১ সাল থেকে চলমান সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনায় সুব্রত বাইনসহ চারজনের দণ্ডাদেশ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে। আগামী সাক্ষ্য গ্রহণ ও আদালতের রায় এই মামলার চূড়ান্ত পর্যায়ে আসামিদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এই রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এবং বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবীরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।
শহরের বিভিন্ন আইন বিশ্লেষক মনে করছেন, এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া দেশের সন্ত্রাস দমন নীতি ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। আদালতের মাধ্যমে সঠিকভাবে প্রমাণ উপস্থাপন এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম বন্ধে সহায়ক ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে।
বিচার কার্যক্রম চলাকালীন সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে, যাতে কোনো প্রভাব বা হস্তক্ষেপ ঘটতে না পারে। এই মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ চারজনের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।










