এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দিলেন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫২ বার
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দিলেন

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা / একটি বাংলাদেশ ডেস্ক

দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ না হলে চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক বিক্ষোভ মিছিল শেষে শিক্ষকরা জানিয়েছেন, সরকারের কাছ থেকে তাদের তিন দফা দাবিতে এখনো কোনো সাড়া মেলেনি। এই পরিস্থিতিতে যদি দ্রুত সমাধান না আসে, তবে তারা রোববার যমুনা ঘেরাও কর্মসূচি চালানোর জন্য বাধ্য হবেন।

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব দেলোয়ার হোসেন আজিজী বলেন, “আমরা বহুদিন ধরে আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের চেষ্টা করছি। ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা এবং অন্যান্য তিন দফা দাবি পূরণ না হলে আমাদের আন্দোলন আরও তীব্র হবে। সরকার যদি এখনো আমাদের পাশে না আসে, আমরা ঘর ফিরব না এবং চূড়ান্ত কর্মসূচি শুরু করব।”

বিক্ষোভের সময় বিকাল ৩টার পর শিক্ষকরা শহীদ মিনারের বেদিতে অবস্থান নিয়ে অনশন শুরু করেন। সেখানে উপস্থিত শিক্ষকরা বৃষ্টির মধ্যে ভিজে স্লোগান দেন, বক্তব্য রাখেন এবং একত্রিত হয়ে নিজেদের দাবি জানান। সরেজমিনে দেখা যায়, শিক্ষকরা মানসিকভাবে দৃঢ়ভাবে আন্দোলন চালাচ্ছেন। তারা বলেন, এই সংগ্রাম শুধু নিজেদের জন্য নয়, ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্যও।

খুলনা থেকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষক আসমা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, “যুগের পর যুগ ধরে মাত্র এক হাজার টাকা বাড়ি ভাতা দেওয়া হতো। আমরা দাবি তুলেছিলাম, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় তারা ২ হাজার টাকায় সম্মত হয়েছেন। কিন্তু এখন ২ হাজার টাকায় কোথাও ভাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা চাই ন্যায্য বৃদ্ধি, যাতে আমরা আমাদের পেশাগত দায়িত্ব নির্বিঘ্নে পালন করতে পারি।”

নড়াইল থেকে আসা রবিউল আলম বলেন, “আমরা সকাল থেকে এখানে জড়ো হচ্ছি। গতকালও অনেক শিক্ষক ছিলেন। একদল গ্রামে ফিরে যাচ্ছে, আরেকদল আসছে। এভাবে আমরা ছয় দিন ধরে টানা আন্দোলন চালাচ্ছি। সরকারের কোনও সাড়া এখনো পাইনি, তাই আমাদের ধৈর্য্য শেষের পথে।”

শিক্ষকদের দাবি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি ভাতা অপর্যাপ্ত; দ্বিতীয়ত, শিক্ষা সেক্টরের কর্মচারীদের জন্য বেতন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ন্যায্য হারের অভাব; এবং তৃতীয়ত, সরকারি প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন। শিক্ষকরা মনে করছেন, অন্যান্য পেশার মানুষ যেভাবে বাড়ি ভাতা পাচ্ছেন, সেখানে শিক্ষকদের পুরোনো বেতন স্কেল অনুযায়ী দেওয়া ভাতা দিয়ে শহর বা গ্রামে বাসা ভাড়া নেওয়া সম্ভব নয়।

টানা ছয় দিন ধরে তারা রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শিক্ষা অফিস ও শাহবাগ এলাকায় অবস্থান ও আন্দোলন চালাচ্ছেন। এ আন্দোলনে শিক্ষকদের ছয়টি সংগঠন একত্র হয়ে যৌথভাবে অংশগ্রহণ করছে। আন্দোলনকারীরা দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তারা সরকারের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন যে, শিক্ষকদের অধিকার উপেক্ষা করা যাবে না।

বিক্ষোভ চলাকালীন শিক্ষকরা বিভিন্ন স্লোগান দেন, যার মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ ও দাবি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। তারা বলেন, “আমরা সরকারকে সরাসরি বলছি, আমাদের রক্ত ও শ্রমের মূল্যায়ন করতে হবে। আমাদের দাবি পূরণ না হলে চূড়ান্ত আন্দোলন ছাড়া আমাদের আর বিকল্প থাকবে না।”

শিক্ষকদের এই আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য নয়; এটি শিক্ষার মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা রক্ষারও প্রতীক। তারা মনে করছেন, যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ও ন্যায্য বেতন না দেওয়া হলে শিক্ষকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন না। বৃষ্টিভেজা পরিবেশে অবস্থান নেয়ার মধ্য দিয়েই তাদের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ পায়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আন্দোলন শুধু শিক্ষকদের দাবি পূরণের জন্য নয়, এটি দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ। শিক্ষকেরা যখন নিজের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য এগিয়ে আসছেন, তখন এটি শিক্ষার্থীদের জন্যও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করবে। শিক্ষকদের এই সংগ্রাম শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শহীদ মিনারে অবস্থানরত শিক্ষকরা জানান, তারা শুধুমাত্র নিজস্ব সুবিধার জন্য নয়, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। বিক্ষোভের সময় শিক্ষকেরা একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছেন, যা তাদের ঐক্য এবং দৃঢ় সংকল্পকে প্রমাণ করছে। তারা আশা করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ সাড়া এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হবে।

এভাবে শুক্রবারের আন্দোলন কেবল একটি বিক্ষোভ নয়, এটি শিক্ষাক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করার এক সুস্পষ্ট সংকেত। শিক্ষকদের দৃঢ় অবস্থান ও সংগ্রামের মাধ্যমে সরকারকে জানানো হচ্ছে যে, তাদের দাবি পূরণ ছাড়া ভবিষ্যতে শিক্ষক সমাজ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে না।

শিক্ষকদের এই চূড়ান্ত আন্দোলন আগামী দিনে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি প্রমাণ করে যে, যদি সমাজ ও সরকার শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান না করে, তবে তারা শক্তিশালী আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি আদায় করতে বাধ্য হবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত