শিক্ষকদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ হাসনাত-জারার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩২ বার
শিক্ষকদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ হাসনাত-জারার

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধিসহ তিন দফা দাবিতে টানা আটদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাদের আমরণ অনশন চলছে টানা ৪২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। এ সময়ের মধ্যে অসংখ্য শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

রোববার (১৯ অক্টোবর) ভোরে জাতীয় রাজনৈতিক সম্মিলন (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ও তাসনিম জারা শহীদ মিনারে গিয়ে অনশনরত শিক্ষকদের খোঁজ-খবর নেন। তারা আন্দোলনরত শিক্ষক নেতাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে জানান, “ন্যায্য দাবির পক্ষে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামানো উচিত নয়।”

২৫ দলের নেতারা স্বাক্ষর করলেন জুলাই জাতীয় সনদ

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে জানান, হাসনাত ও জারার আগমন শিক্ষকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা এনে দিয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা এখন যে আন্দোলন করছি, তা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। সরকার যদি এখনো কান না দেয়, তবে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবো।”

অধ্যক্ষ আজিজী জানান, আজ সকাল থেকেই শিক্ষকরা শিক্ষা ভবন অভিমুখে “ভূখা মিছিল” করবেন। এ সময় তারা খালি থালা-বাসন হাতে নিয়ে রাস্তায় নামবেন, যা হবে তাদের ক্ষোভ ও বঞ্চনার প্রতীক। শনিবার রাতে এক ঘোষণায় তিনি বলেন, “আমরা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করছি, অথচ নিজেদের জীবনে নিরাপত্তা বা মর্যাদার নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির পরও ফল না পাওয়ায় খালি থালা হাতে নামা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার চাইলে যে কোনো সময় এই সংকটের সমাধান সম্ভব। আমরা করুণা নয়, প্রাপ্য মর্যাদা চাই। শিক্ষক সমাজ আজ হতাশ, কিন্তু মাথা নত করবে না।”

দীর্ঘদিন ধরেই বাড়িভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে মাত্র ৫০০ টাকা বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ৩০ সেপ্টেম্বর, যা ৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবসে প্রকাশিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রজ্ঞাপনটি “প্রহসনমূলক” আখ্যা দিয়ে শিক্ষক নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ঘোষণা দেন, তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন যতক্ষণ না ন্যায্য দাবি পূরণ হয়।

গত ১২ অক্টোবর শিক্ষকরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিলে সেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন শিক্ষক আহত হন। এরপর বিকেলে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নেন এবং সেখান থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরদিন থেকেই সারাদেশে প্রায় ৩০ হাজার স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়। ফলে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

শিক্ষকদের আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবিগুলো মূলত তিনটি। প্রথমত, মূল বেতনের ওপর ২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া প্রদান। দ্বিতীয়ত, মাসিক ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা। তৃতীয়ত, এমপিওভুক্ত কর্মচারীদের জন্য ৭৫ শতাংশ উৎসব ভাতা বা বোনাসের নিশ্চয়তা। শিক্ষকরা বলছেন, সরকারের এ তিনটি দাবি বাস্তবায়ন করা মোটেও কঠিন নয়, বরং এটি তাদের মর্যাদা ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নতুন প্রস্তাব কার্যকর করা সম্ভব নয়। এক কর্মকর্তা বলেন, “সরকার শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে সংবেদনশীল, তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।”

শিক্ষকদের অনশন ঘিরে শহীদ মিনার এলাকায় সাধারণ মানুষের ভিড়ও বেড়েছে। অনেকেই শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি জানাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও শিক্ষকদের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন জানিয়েছেন।

এক শিক্ষক, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন, “আমরা কোনো রাজনীতি করতে আসিনি। শুধু চাই আমাদের পরিবারের মতো বাঁচার নিশ্চয়তা। আজ আটদিন ধরে আমরা না খেয়ে আছি, কিন্তু সরকারের কোনো প্রতিনিধি আসেনি। এটা কষ্ট দেয়।”

শিক্ষক সমাজের এই অনশনকে অনেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার পরীক্ষাস্বরূপ বলে মনে করছেন। শিক্ষানুরাগীরা বলছেন, যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করেন, তাদের মৌলিক দাবি অবহেলা করা মানে দেশের ভিত্তিকে দুর্বল করা।

অধ্যক্ষ আজিজী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে বলেন, “যদি দ্রুত ইতিবাচক সাড়া না আসে, আমরা অনশন আরও বিস্তৃত করব। এই লড়াই শুধু বাড়িভাড়ার নয়, এটি শিক্ষক সমাজের সম্মানের লড়াই।”

এখন পর্যন্ত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনার উদ্যোগ নেয়নি। তবে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘ আন্দোলন চললে তা শুধু শিক্ষা নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

শিক্ষক সমাজ আশায় আছে, সরকার শেষ পর্যন্ত তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল হবে এবং এ অনশন কোনো দুঃখজনক ঘটনার আগেই শেষ হবে। তবে আপাতত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চলছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার লড়াই—ন্যায্য অধিকার না পাওয়া পর্যন্ত তারা পিছু হটবেন না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত