ঢাকা স্ট্রিমের তরুণী গ্রাফিক ডিজাইনারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: যৌন হয়রানির অভিযোগের পর রহস্যজনক মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮২ বার

প্রকাশ: সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব প্রতিবেদক │ একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাট থেকে স্বর্ণময়ী বিশ্বাস (২৬) নামে এক তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিম-এ গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন স্বর্ণময়ী। তার মৃত্যুকে ঘিরে এখন মিডিয়া জগতে নেমেছে নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রশ্নের ঝড়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে স্বর্ণময়ীর ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান তার সহকর্মীরা। তারা দ্রুত পুলিশে খবর দেন। ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা মনে হলেও, ঘটনাটির পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তের সূত্র ধরে উঠে এসেছে, স্বর্ণময়ী সম্প্রতি তার অফিসের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলা বিভাগ প্রধান আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। তিনি লিখিতভাবে অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন ঢাকা স্ট্রিম-এর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, আলতাফ শাহনেওয়াজ তাকে বারবার অশোভন মন্তব্য ও অঙ্গভঙ্গি করতেন, কাজের প্রয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করতে বাধ্য করতেন এবং তার চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে পরোক্ষ হুমকিও দিতেন।

স্বর্ণময়ীর সহকর্মীদের দাবি, এই অভিযোগ তদন্তের পরিবর্তে বরং উল্টো ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার বিরুদ্ধেই। অভিযুক্ত আলতাফ শাহনেওয়াজকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও, মাত্র দুই সপ্তাহ পর তাকে পুনর্বহাল করেন ঢাকা স্ট্রিম-এর প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকেই অফিসে মানসিক চাপ ও অপমানের পরিবেশে কাজ করছিলেন স্বর্ণময়ী। এক সহকর্মী বলেন, “ওর চোখে প্রতিদিন আতঙ্ক দেখতাম। ও বলত, ‘আমি ন্যায়ের জন্য লড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু সবাই আমাকে একা করে দিয়েছে।’”

ঘটনার পটভূমিতে আরও জানা গেছে, ইফতেখার মাহমুদ এবং আলতাফ শাহনেওয়াজ দুজনেই সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলো থেকে ঢাকা স্ট্রিম-এ যোগ দেন। তাদের ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব এবং নারী কর্মীদের প্রতি অমানবিক আচরণের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর পর সেই অভিযোগগুলো আবারও সামনে এসেছে।

মানবাধিকার সংগঠন ও নারী অধিকারকর্মীরা এই ঘটনাকে ‘অফিস সংস্কৃতির ভয়াবহ ব্যর্থতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। নারী সাংবাদিকদের সংগঠন ন্যাশনাল উইমেন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে বলেছে, “একজন তরুণ পেশাজীবী, যিনি কর্মক্ষেত্রে নিজের মর্যাদা ও নিরাপত্তার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, তাকে এমন পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।” তারা অবিলম্বে আলতাফ শাহনেওয়াজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।

অন্যদিকে ঢাকা স্ট্রিম কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা অনুচিত হবে। প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে।” তবে প্রতিষ্ঠানের এই নির্লিপ্ত অবস্থান নিয়েও সমালোচনা উঠেছে, বিশেষত যখন অভিযোগের নথি ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের প্রমাণ ইতোমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সূত্র জানিয়েছে, স্বর্ণময়ীর ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও অফিস ইমেইল অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। এগুলোতে হয়রানি সংক্রান্ত কথোপকথন বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তা মামলার অংশ হবে। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক তদন্তে ‘মানসিক নির্যাতন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা’ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

স্বর্ণময়ীর পরিবার এখনো স্তম্ভিত। তার বড় ভাই বলেন, “আমার বোন জীবনের প্রতি ভালোবাসায় ভরপুর ছিল। সে আত্মহত্যা করতে পারে না। আমরা বিশ্বাস করি, এই মৃত্যু আত্মহত্যা নয়—বরং তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছে।”

সাংবাদিক সমাজে এই ঘটনাটি একটি গভীর আত্মসমালোচনার সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ভেতরেও যদি নারী কর্মীরা নিরাপত্তা না পান, তাহলে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে—এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মীরা।

স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর তদন্ত এখন পুলিশের হাতে। কিন্তু সামাজিক প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—একজন তরুণ পেশাজীবী, যিনি ন্যায়বিচারের আশায় নিজের কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ তুলেছিলেন, তাকে কি শেষ পর্যন্ত একা ফেলে দেওয়া হলো?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত