অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিযান: গ্রেপ্তার প্রায় ৫ লাখ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪০ বার
অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিযান: গ্রেপ্তার প্রায় ৫ লাখ

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অন্যতম — অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ — বাস্তবায়নে অভূতপূর্ব কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক ধরপাকড় অভিযান, যার ফলে গত নয় মাসে প্রায় পাঁচ লাখ অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগ। এই অভিযানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক, পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সোমবার ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালে চার লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং আইনভিত্তিক আমেরিকা গড়ে তুলতে কাজ করছি। পরিবারগুলো যেন ভয়হীনভাবে বাঁচতে পারে এবং আমেরিকার স্বাধীনতার মূল মূল্যবোধ উপভোগ করতে পারে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”

নোয়েম আরও উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তার হওয়া অভিবাসীদের প্রায় ৭০ শতাংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে অথবা তারা পূর্বে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বাকি ৩০ শতাংশের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই অভিযান মূলত দক্ষিণ সীমান্তে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অনুপ্রবেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় ইস্যু। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে টেক্সাস, অ্যারিজোনা ও ক্যালিফোর্নিয়া সীমান্তে বাড়ানো হয়েছে টহল ও নজরদারি। অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বলছে, শুধু টেক্সাসের রিও গ্র্যান্ড ভ্যালি অঞ্চলে গত তিন মাসেই প্রায় ৯০ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র বিভাগ জানিয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই অবৈধ অভিবাসন রোধে কঠোর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ অবৈধ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ১.৬ মিলিয়ন স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছেন এবং ২৫০ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে চার লাখের বেশি অভিবাসীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাসিত করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও এই অভিযানের প্রশংসা করে সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা আমেরিকাকে পুনরায় নিরাপদ করছি। বছরের পর বছর ধরে যে সীমান্তগুলো অবহেলিত ছিল, সেগুলোতে এখন আইন ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। যারা আইন ভেঙেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে জায়গা পাবে না।”

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতি নিয়ে দেশজুড়ে চলছে বিতর্ক। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, “অভিবাসন আইন প্রয়োগের নামে পরিবারগুলোকে আলাদা করা, ছোট বাচ্চাদের আটক করা এবং শরণার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।” সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে “মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি” গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারাও ট্রাম্পের নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, এই অভিযান কেবল অবৈধ অভিবাসীদের নয়, বরং অভিবাসী সমাজের বৈধ নাগরিকদের মধ্যেও ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সিনেটর মারিয়া গনজালেজ বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসন মানবিক বিবেচনা ভুলে গেছে। এখনকার যুক্তরাষ্ট্র যেন একটি ভয় আর বিভাজনের দেশে পরিণত হচ্ছে।”

তবে রিপাবলিকান নেতারা বিপরীত মত পোষণ করছেন। তারা মনে করছেন, ট্রাম্প দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যা করা প্রয়োজন তাই করছেন। রিপাবলিকান সিনেটর মিচ র‍্যান্ডাল বলেন, “আমেরিকার সীমান্ত কারো খেলার জায়গা নয়। যেকোনো রাষ্ট্রের মতো আমাদেরও অধিকার আছে নিজেদের সীমানা সুরক্ষিত রাখার।”

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান শুধু অভিবাসন ইস্যুই নয়, বরং আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। কারণ “আইন ও শৃঙ্খলা” এখন ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক স্লোগান।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ অবৈধ অভিবাসী বাস করছে বলে ধারণা করা হয়। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন। ট্রাম্পের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, যারা নাগরিকত্ব বা বৈধ অবস্থার আবেদন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে নির্বাসিত করা হবে।

এদিকে অভিবাসী অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই কঠোর নীতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মানবিক ইমেজ ও বৈচিত্র্যের গৌরবকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিউ ইয়র্কের অভিবাসন অধিকারকর্মী এলেনা রদ্রিগেজ বলেন, “আমেরিকা একসময় ছিল স্বপ্নের দেশ, এখন এটি হয়ে উঠছে ভয়ের দেশ।”

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, অভিযান চলবে যতদিন পর্যন্ত না “দেশ সম্পূর্ণ নিরাপদ” হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে — নিরাপত্তার সংজ্ঞা কতটা মানবিক এবং কতটা রাজনৈতিক? সেই উত্তর সময়ই দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত