ভারতের সঙ্গে ১০টি চুক্তি বাতিল – নীরব পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮৮ বার
ভারতের সঙ্গে ১০টি চুক্তি বাতিল - নীরব পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ভারতের সঙ্গে বিগত সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত ১০টি চুক্তি ও প্রকল্প বাতিলের বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন মন্তব্য করতে রাজি হননি। সোমবার রাজধানীর তাঁর দপ্তরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলব না।” তাঁর এই সংযত অবস্থান কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা ও নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।

এই চুক্তি বাতিলের তথ্য প্রথমে প্রকাশ্যে আনেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। রোববার রাতে নিজের ফেসবুক পেজে তিনি একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে জানান, ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০টি প্রকল্প ও সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। তিনি লেখেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এসব চুক্তি পর্যালোচনা শুরু হয়, এবং যথাযথ মূল্যায়নের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

আসিফ মাহমুদের পোস্টটি প্রকাশের পর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এই সিদ্ধান্ত কি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কোনো দিক নির্দেশনা দিচ্ছে? নাকি এটি কেবল প্রশাসনিক পুনর্মূল্যায়নের অংশ?

আসিফের পোস্টে উল্লেখিত বাতিল হওয়া চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম রেল সংযোগ প্রকল্প, অভয়পুর-আখাউড়া রেলপথ সম্প্রসারণ, আশুগঞ্জ-আগরতলা করিডর উন্নয়ন, ফেনী নদী পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, ভারত-বাংলাদেশ বন্দর ব্যবহারের সড়ক ও নৌপথ উন্নয়ন চুক্তি, ফারাক্কাবাদ সম্পর্কিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রস্তাব, সিলেট-শিলচর সংযোগ প্রকল্প, ভারতীয় পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন সম্প্রসারণ, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (মিরসরাই ও মোংলা আইইজেড), এবং ভারতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানি জিআরএসইর সঙ্গে টাগ বোট সরবরাহ চুক্তি।

এই প্রকল্প ও চুক্তিগুলোর বেশিরভাগই বাংলাদেশের অবকাঠামো, বন্দর এবং সীমান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন লক্ষ্য করে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে দেশীয় বিশ্লেষকদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছিলেন, এসব চুক্তি বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, বরং ভারতের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তবে যেকোনো চুক্তি বা প্রকল্পের মূল ভিত্তি হতে হবে সমতা ও পারস্পরিক লাভ। বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপ সম্ভবত সেই ভারসাম্য পুনঃস্থাপনের চেষ্টা।”

অন্যদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, চুক্তিগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত আকস্মিক নয়। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতসহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষত যেসব প্রকল্পে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ বা অর্থনৈতিক দায়ভার প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, সেগুলোকেই পুনর্বিবেচনায় নেওয়া হয়।

তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে “বাংলাদেশের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত” হিসেবে দেখছে। টাইমস অব ইন্ডিয়াহিন্দুস্তান টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিস্মিত করেছে। তারা বলছে, “বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।”

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। তবে আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই এগোবে।”

বাংলাদেশের ভেতরেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমত দেখা গেছে। একাংশ মনে করছে, সরকার দেশীয় স্বার্থ সংরক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। আবার অনেকে বলছেন, কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা না করলে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের নীরবতা তাই আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক সাধারণত পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে থাকেন। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে মন্তব্য না করা ইঙ্গিত দেয় যে, বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকার বিষয়টি কূটনৈতিক সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে চায়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ—ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট রাখা, একইসঙ্গে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখা। চুক্তি বাতিলের এই সিদ্ধান্ত সেই ভারসাম্যের নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে, যার প্রভাব দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতা কাঠামোতেও পড়বে।

যদিও সরকারিভাবে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা আসেনি, তবে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন নতুন এক বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে—যেখানে সমতা, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপসের জায়গা থাকবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত