জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জোবায়েদ হত্যায় মামলা, গ্রেপ্তার এক অভিযুক্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৪ বার
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জোবায়েদ হত্যায় মামলা, গ্রেপ্তার এক অভিযুক্ত

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জোবায়েদ হোসেন হত্যাকাণ্ডে নতুন অগ্রগতি হয়েছে। নিহতের বাবা বাদী হয়ে বংশাল থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করেছেন। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুরো ঘটনাটি এখন রাজধানীর অন্যতম আলোচিত হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।

পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকালে নিহত জোবায়েদের বাবা মামলা দায়ের করেন, যেখানে একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলার পরপরই অভিযানের মাধ্যমে পুলিশ মাহির রহমান নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার ঘটনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে বলে দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এর আগে রোববার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আরমানিটোলায় টিউশনিতে গিয়ে খুন হন জোবায়েদ হোসেন। তিনি ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদল আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তার রক্তাক্ত মরদেহ আরমানিটোলার একটি বাড়ির সিঁড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে থাকা বই, খাতা ও রক্তের দাগ দেখে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়।

জানা গেছে, জোবায়েদ নিয়মিতভাবে ওই এলাকার এক স্কুলছাত্রী বর্ষাকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান পড়াতেন। এক বছর ধরে তিনি ওই বাড়িতেই টিউশনি করতেন। ঘটনার দিনও বিকেলে তিনি বর্ষার বাসায় পড়াতে যান, কিন্তু কিছু সময় পরই সেখান থেকে তার মৃত্যুর খবর আসে।

ঘটনার পর পুলিশ বর্ষাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। রোববার রাত ১১টার দিকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে থানায় আনা হয়। তবে এ পর্যন্ত পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে আসামি হিসেবে দেখায়নি।

বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, “মামলাটি আমরা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, ঘটনাটি ব্যক্তিগত বিরোধ বা সম্পর্কজনিত কোনো বিষয় থেকে ঘটতে পারে। তবে আমরা কোনো সম্ভাবনাকেই বাদ দিচ্ছি না। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

নিহত জোবায়েদের পরিবার বলছে, তাদের ছেলে খুবই বিনয়ী ও শান্ত স্বভাবের ছাত্র ছিল। তার কোনো শত্রু ছিল না। তারা দাবি করেছেন, পরিকল্পিতভাবে তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জোবায়েদের এক আত্মীয় জানান, “সে প্রতিদিন ওই বাসায় টিউশনি করতে যেত। সেই জায়গাটিই তার মৃত্যুর স্থান হবে, তা আমরা ভাবতেই পারছি না। আমরা ন্যায়বিচার চাই।”

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদ সমাবেশে শিক্ষার্থীরা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বক্তারা বলেন, “জোবায়েদ হত্যার বিচার দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। এটি আরেকটি উদাহরণ যেন না হয়, যেখানে ছাত্রদের হত্যা করে মামলা ধামাচাপা পড়ে যায়।”

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সেলিনা পারভীন বলেন, “আমরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। এই ঘটনার ন্যায্য বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার চুপ করে থাকবে না।”

এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর পুরো আরমানিটোলা এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিকেলের দিকে তারা তীব্র চিৎকারের শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে পুলিশ এসে রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন বাড়িটির ভেতরের সিসিটিভি ক্যামেরার কিছু অংশ নষ্ট ছিল। তবে আশেপাশের ভবনের ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, যা তদন্তে সহায়তা করবে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে।

একজন তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত। হত্যার পেছনে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, টিউশনি সংক্রান্ত বিরোধ, বা অন্য কোনো জটিল কারণ থাকতে পারে। আমরা সব দিক যাচাই করছি।”

নিহত জোবায়েদের সহপাঠীরা জানিয়েছেন, তিনি মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্র ছিলেন। তাঁকে হারিয়ে তারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর এক সহপাঠী বলেন, “জোবায়েদ শুধু আমাদের বন্ধু নয়, সে ছিল আমাদের অনুপ্রেরণা। তার মতো একজন মানুষকে এমনভাবে হারানো আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।”

বর্তমানে মামলার তদন্ত কাজ চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিদের মধ্যে কারও বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সীমান্ত ও বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করা হবে। অন্যদিকে, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের দাবি উঠেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং দেশের শিক্ষা পরিবেশে ছাত্রদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়—এই হত্যার তদন্ত কতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে শেষ হয় এবং বিচার কতটা নিশ্চিত করা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত