জবি ছাত্র জোবায়েদ হত্য-মাহির -বর্ষা যেনো ”মিন্নির’ মতো ত্রিভুজ প্রেমের ট্রাজেডি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৪ বার
জবি ছাত্র জোবায়েদ হত্য-মাহির -বর্ষা যেনো ''মিন্নির' মতো ত্রিভুজ প্রেমের ট্রাজেডি

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—প্রায় এক মাস আগে থেকেই এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বর্ষা ও তার প্রেমিক মাহির রহমান। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা দুজনই প্রাথমিকভাবে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম।

ঘটনার শুরু হয় এক জটিল প্রেম-ত্রিভুজ থেকে। ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, প্রায় নয় বছর ধরে প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন বর্ষা ও মাহির। তবে সম্প্রতি বর্ষা তার টিউশন শিক্ষক জোবায়েদ হোসেনের প্রতি আকৃষ্ট হন। বিষয়টি মাহির জানতে পারলে তাদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বর্ষা আবার জোবায়েদের প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং মাহিরের সঙ্গে আলোচনা করে জোবায়েদকে ‘সরিয়ে দেওয়ার’ পরিকল্পনা করেন।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ সেপ্টেম্বর বর্ষা ও মাহির হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা দুটি সুইচগিয়ার কেনেন এবং ঠিক করেন—দুই দিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে জোবায়েদকে হত্যা করা হবে। এই পরিকল্পনায় যুক্ত হয় মাহিরের এক বন্ধু ফারদিন আহম্মেদ আয়লানও।

অবশেষে পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যার আগে আরমানিটোলার নূরবক্স রোডের রৌশান ভিলার নিচে ঘটনাটি ঘটানো হয়। ওই দিন জোবায়েদ তার টিউশনিতে যাচ্ছিলেন। বর্ষা তখন ভেতরে অবস্থান করছিলেন, আর মাহির ও ফারদিন ছিল বাইরে। জোবায়েদ গেট পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই মাহির সুইচগিয়ার দিয়ে তার গলার ডান পাশে আঘাত করেন। রক্তক্ষরণে মুহূর্তের মধ্যেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান।

ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রথমে মেয়েটি হত্যার কথা অস্বীকার করলেও মাহিরের মুখোমুখি করলে সত্য প্রকাশ পায়। তারা দুজনই স্বীকার করেছে যে, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকেই তারা পরিকল্পনা করেছিল এবং ১৯ অক্টোবর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।”

ঘটনার পর রাতেই পুলিশ বর্ষাকে হেফাজতে নেয় এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে। পরদিন প্রধান আসামি মাহির রহমান ও তার সহযোগী ফারদিন আহম্মেদ আয়লানকেও গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তের স্বার্থে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, হত্যার নেপথ্যে প্রেমঘটিত টানাপোড়েন ছাড়াও প্রতিশোধ ও ব্যক্তিগত অহংকারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্ষা একদিকে মাহিরের দীর্ঘদিনের ভালোবাসাকে ব্যবহার করেছেন, অন্যদিকে জোবায়েদের সান্নিধ্যে এসে নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিলেন। সেই জটিল সম্পর্কই পরিণত হয় এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে।

জোবায়েদ হোসেন ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তার সহপাঠী ও বন্ধুরা জানান, তিনি মেধাবী, প্রাণবন্ত ও সংগঠনের কাজে নিবেদিত ছিলেন। হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। ক্যাম্পাসে ছাত্রদলসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে এবং দ্রুত বিচার দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু নয়, এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও সম্পর্কের বিকৃতি দেখা দিচ্ছে, তা এখন সমাজের জন্য বড় সতর্কবার্তা।”

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যবহৃত অস্ত্র, মোবাইল ফোন, এবং পরিকল্পনায় ব্যবহৃত বার্তাগুলোর ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলাটি এখন হত্যার দায়ে রেকর্ড করা হয়েছে এবং তদন্তাধীন রয়েছে।

এদিকে জোবায়েদের পরিবার এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। তার ভাই বলেন, “আমার ভাই কোনো রাজনীতি বা শত্রুতা করত না। সে শুধু পড়াশোনা আর সংগঠনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। আমরা চাই, যারা তাকে এত নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তারা যেন কঠোরতম শাস্তি পায়।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত