শনিবারেও ক্লাস, আন্দোলন স্থগিতের পর ফিরছেন শিক্ষকরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫১ বার
শনিবারেও ক্লাস, আন্দোলন স্থগিতের পর ফিরছেন শিক্ষকরা

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

‘যে আট দিন শ্রেণিকক্ষে যেতে পারিনি, তা পুষিয়ে দেব’

দেশব্যাপী টানা আট দিনব্যাপী আন্দোলনের পর অবশেষে শ্রেণিকক্ষে ফিরছেন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে তাদের বাড়িভাড়া ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করার ঘোষণা আসার পর শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শনিবারও ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শিক্ষকরা।

মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয়করণপ্রত্যাশী শিক্ষক-কর্মচারী জোটের সদস্যসচিব দেলোয়ার হোসেন আজিজী এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “গত আট দিন শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে যেতে পারেননি। এটি ছিল আমাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লড়াই। তবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা যেন ব্যাহত না হয়, সেজন্য আমরা বার্ষিক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত প্রতি শনিবার ক্লাস চালিয়ে যাব। যে আট দিন শ্রেণিকক্ষে যেতে পারিনি, তা পুষিয়ে দেব।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার আমাদের দাবি শুনেছে এবং ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। আমরা জানি, সরকার শুধু আমাদের নিয়েই নয়, আরও অনেক খাতের দাবি-দাওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়। সেই জায়গা থেকেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আমাদের বড় দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, যা এখন বাস্তবায়নের পথে। আজ আমি আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি, আমরা আন্দোলন করে প্রজ্ঞাপন হাতে নিয়ে ফিরে যাচ্ছি।”

সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ওপর ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা দুই ধাপে কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে চলতি বছরের নভেম্বরের ১ তারিখ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িভাড়া (ন্যূনতম দুই হাজার টাকা) এবং দ্বিতীয় ধাপে ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে আরও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনাও পাঠানো হয়েছে, যেখানে কিছু শর্তও যুক্ত করা হয়েছে।

দেলোয়ার হোসেন আজিজী বলেন, “আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় মেডিকেল ভাতা সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু ছাড় দিয়েছি। এটা আমাদের আন্দোলনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল, যাতে মূল দাবি বাস্তবায়ন হয়। সরকারও আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তাই আমরা মনে করি, এটি শিক্ষকদের একটি বড় বিজয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের আন্দোলন শুধু ব্যক্তিগত দাবি নয়, এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষকরা যদি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে থাকেন, তাহলে শিক্ষার মানও উন্নত হবে। তাই সরকারের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যারা আন্দোলনের সময়ে নৈতিক সমর্থন জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “শিক্ষকদের দাবি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। তবে যেসব রাজনৈতিক দল আমাদের দাবি-দাওয়াকে মানবিকভাবে দেখেছে, আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”

উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, পূর্ণাঙ্গ জাতীয়করণসহ কয়েকটি দাবিতে আন্দোলনে নামে। দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল-কলেজে পাঠদান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে শিক্ষক সমাজে স্বস্তি ফিরেছে, এবং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন স্থগিতের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষক-কর্মচারী উপকৃত হবেন। এ পদক্ষেপ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াবে এবং তাদের পেশাগত স্থিতি আরও দৃঢ় করবে।

দেলোয়ার হোসেন আজিজী সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান, “আমরা চাই না শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হোক। তাই শনিবারগুলোতে স্কুল খোলা থাকবে। যেসব ক্লাস মিস হয়েছে, সেগুলো আমরা পুনরায় নেব। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিকে সম্পূর্ণ করতে শিক্ষকরা নিজেদের দায়িত্বের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাজ করবেন।”

শিক্ষকদের এই সিদ্ধান্তে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে এক ধরনের ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আন্দোলন শেষ হলেও শিক্ষক সমাজ আশা করছে, সরকারের প্রতিশ্রুতি যেন যথাসময়ে বাস্তবায়িত হয় এবং ভবিষ্যতে এমন আন্দোলনের প্রয়োজন না পড়ে।

অভিভাবকরাও বলছেন, “শিক্ষকদের দাবিগুলো যৌক্তিক ছিল। সরকার তা মেনে নিয়েছে, এটা স্বস্তিদায়ক। এখন প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ক্ষতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধি শিক্ষকদের আর্থিক স্বস্তি এনে দেবে, যা পরোক্ষভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে তারা মনে করেন, শিক্ষক সমাজের মানোন্নয়নে কেবল আর্থিক প্রণোদনা নয়, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষা নীতিতে সংস্কারও জরুরি।

সব মিলিয়ে, সরকারের প্রজ্ঞাপন ও শিক্ষকদের সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে একটি স্বস্তির বার্তা পৌঁছেছে। আন্দোলনের অচলাবস্থা কেটে গিয়ে শিক্ষাঙ্গনে ফিরছে স্বাভাবিক ছন্দ, আর শিক্ষার্থীরা ফিরে পাচ্ছে তাদের প্রিয় শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের প্রাণচাঞ্চল্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত