প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে লেখা একটি সাইনবোর্ড টাঙানোর জেরে মুসলিমদের ওপর শুরু হয়েছে নতুন এক দমন–পীড়ন। ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা সেই আলোকসজ্জিত সাইনবোর্ড ঘিরে ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো রাজ্যজুড়ে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে একাধিক এফআইআর দায়ের হয়েছে, মুসলিম নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রশাসনের অভিযানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে।
ঘটনাটি ঘটে গত ৪ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের শিল্পনগরী কানপুরের সৈয়দ নগরে। ঈদে মিলাদুন্নবি উদ্যাপন উপলক্ষে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাটিতে শ্রমজীবী বাসিন্দারা নিজেদের মতো করে আলো, পতাকা ও ব্যানারে সাজাচ্ছিলেন। তাঁদের উদ্যোগে স্থাপন করা হয় একটি আলোকসজ্জিত সাইনবোর্ড, যেখানে লেখা ছিল: “আই লাভ মুহাম্মদ”। ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে লাল রঙের একটি হৃদয়চিহ্নও ছিল সেখানে। এটি ছিল ঈদে মিলাদুন্নবির সাজসজ্জারই অংশ।
তবে রাত নামতেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী একদল পুরুষ এসে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে। তারা অভিযোগ করে, সাইনবোর্ডটি নাকি হিন্দু ধর্মীয় স্থানের কাছাকাছি স্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাইনবোর্ডটি খুলে ফেলে এবং “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” ও “সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা”র অভিযোগে সৈয়দ নগরের নয়জন মুসলিম পুরুষসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। যদিও ঘটনাটির এক মাস পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
স্থানীয় এক হিন্দু সংগঠনের সদস্য মোহিত বাজপেয়ী বলেন, “আমাদের নবী মুহাম্মদকে ভালোবাসার কথার প্রতি কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু হিন্দু উৎসবের জন্য নির্ধারিত স্থানে এটি কেন টাঙানো হলো, সেটিই প্রশ্ন।” অন্যদিকে মুসলিম বাসিন্দারা বলছেন, তাঁরা প্রতিবার ঈদে মিলাদুন্নবি উপলক্ষে ওই স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজন করেন এবং এ বছরও সেই ধারাবাহিকতায় সাইনবোর্ডটি স্থাপন করা হয়েছিল। তাদের দাবি, সাইনবোর্ডের জন্য সরকারি অনুমতিও ছিল।
ঘটনার কয়েক দিন পর কানপুরের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে উত্তর প্রদেশের আরেক শহর বেরেলিতে। মুসলিম সংগঠন ইত্তেহাদ–ই–মিল্লাত কাউন্সিলের (আইএমসি) প্রধান মাওলানা তৌকির রেজা খান ২১ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা অপরাধ নয়।” তিনি ২৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবারের জুমার নামাজ শেষে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দেন।
তবে বেরেলির প্রশাসন সেই সমাবেশের অনুমতি দেয়নি। তবুও হাজার হাজার মুসলমান নামাজ শেষে মাজারের সামনে সমবেত হয়ে “আই লাভ মুহাম্মদ (সা.)” লেখা ব্যানার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। কিছু সময় পর পুলিশ লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং তৌকির রেজা খানসহ বহু মুসলিমকে গ্রেপ্তার করে। প্রশাসন শহরে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং কয়েকটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় কড়া নিরাপত্তা জারি করা হয়।
গ্রেপ্তারের আগে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মাওলানা তৌকির রেজা বলেন, “আমরা আমাদের নবীকে ভালোবাসি, এটি বলাটা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশ করাও ভারতে অপরাধে পরিণত হয়েছে। এই দমননীতি কখনোই শুভ পরিণতি বয়ে আনবে না।”
মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর) জানিয়েছে, উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে “আই লাভ মুহাম্মদ (সা.)” লেখা স্লোগানকে কেন্দ্র করে অন্তত ২২টি মামলা দায়ের হয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাদিম খান বলেন, “ভারতের কর্তৃপক্ষ নবীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশকে উসকানিমূলক কাজ হিসেবে দেখছে, যা সাংবিধানিক ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। অনেক ক্ষেত্রেই আইন অনুসরণ না করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে মামলা দায়ের করা হচ্ছে এবং তাঁদের সম্পত্তি উচ্ছেদ পর্যন্ত করা হচ্ছে।”
আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, এই ঘটনাগুলো ভারতজুড়ে মুসলিমদের প্রতি বৈরিতার নতুন রূপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এমনকি স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর ‘নীরব সমর্থন’ এই বৈষম্যমূলক আচরণকে আরও শক্তিশালী করছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিলেও বাস্তবে মুসলিম সম্প্রদায় সেই অধিকার থেকে ক্রমেই বঞ্চিত হচ্ছে। “আই লাভ মুহাম্মদ” লেখা একটি সাইনবোর্ডকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন দেশটির ধর্মীয় সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।