প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দীর্ঘ দেড় বছরের অপেক্ষার পর আবারও সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে শেষ ম্যাচে ১৭৯ রানের দাপুটে জয়ে টাইগাররা শুধু সিরিজ নিজেদের করে নেয়নি, বরং ফিরিয়ে এনেছে হারানো আত্মবিশ্বাস ও দলের পুরোনো ছন্দ। এই জয় বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবধানের জয়। ২০২৩ সালে সিলেটে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮৩ রানে জেতার পর এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৭৯ রানের এই জয় যেন নতুন এক সূচনা লিখে দিলো মেহেদী হাসান মিরাজের দলের জন্য।
মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। সিরিজের আগের দুটি ম্যাচে টপ অর্ডারের ব্যর্থতা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, কিন্তু শেষ ম্যাচে যেন সব দুশ্চিন্তা মিলিয়ে যায়। দুই ওপেনার সৌম্য সরকার ও সাইফ হাসান শুরু থেকেই দারুণ আত্মবিশ্বাসে খেলেন। প্রথম ওভার থেকেই তাঁরা বুঝিয়ে দেন, আজ ব্যাট হাতে বাংলাদেশ অন্য রূপে নামবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসারদের শর্ট বল, ইন-সুইং, বা আউট-সুইং—কোনো কিছুতেই বিচলিত হননি তাঁরা। একের পর এক দারুণ শটে গ্যালারিতে উল্লাসের ঢেউ তুলে দেন দুই ওপেনার।

সাইফ হাসান ও সৌম্য সরকার মিলে বাংলাদেশের ইনিংসের ভিত গড়ে দেন। ২৫.২ ওভারে ১৭৬ রানের জুটি গড়ে তারা বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওপেনিং পার্টনারশিপের রেকর্ড করেন। এর আগে ২০২০ সালে সিলেটে তামিম ইকবাল ও লিটন দাসের ২৯২ রানের রেকর্ডই একমাত্র তাদের ওপরে। সাইফ ৭২ বলে ৮০ রান করেন, ৬টি চার ও ৬টি ছক্কায় সাজানো ইনিংসটি ছিল আত্মবিশ্বাসী ও পরিপক্বতার মিশ্রণ। অপরপ্রান্তে সৌম্য সরকার ৮৬ বলে ৯১ রান করে ফেরেন। তাঁর ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও ৪টি ছক্কা। তবে দুজনই আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছাড়েন—সাইফ বড় শট খেলতে গিয়ে আকাশে বল তুলে দেন, আর সৌম্য সেঞ্চুরির মাত্র ৯ রান দূরে থেকে আকিল হোসেনের বলে ক্যাচ তুলে ফেরেন।
এই দুর্দান্ত সূচনার পরও মাঝের ওভারে রানের গতি কিছুটা কমে যায়। তাওহিদ হৃদয় ও শান্ত চেষ্টা করেও বড় ইনিংস গড়তে পারেননি। হৃদয় ৪৪ বলে ২৮ রান করে ফেরেন, শান্ত ৫৫ বলে ৪৪ রানের ইনিংস খেলেন, কিন্তু তিনিও আউট হন দুর্ভাগ্যজনকভাবে। মাঝের সারিতে নামা মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন ব্যাট বদলেই বোল্ড হয়ে যান, রিশাদ হোসেন মাত্র ৩ রান করে ফেরেন, নাসুমও ১ রানেই আউট হন। এক সময় বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে থাকা তিনশোর স্বপ্ন ধীরে ধীরে নিভে আসে। শেষ দিকে মেহেদী হাসান মিরাজ ও নুরুল হাসান সোহান কিছুটা লড়াই করে রান তুললেও ইনিংস শেষ পর্যন্ত থামে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৯৬ রানে। যদিও স্লগ ওভারে রান তোলায় ব্যর্থতা ছিল স্পষ্ট, তবে মিরপুরের উইকেট ও স্পিন-বান্ধব কন্ডিশনে এই রান প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বোলিংয়ে নেমে বাংলাদেশ দেখিয়েছে তাদের প্রকৃত শক্তি। শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রিত স্পিন ও কৌশলী বোলিংয়ে চাপে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। বল হাতে নাসুম আহমেদ ছিলেন বিধ্বংসী। ইনিংসের পঞ্চম ওভারেই আঘাত হানেন তিনি। আলিক আথানেজে (১৫) এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে পড়ে ফেরেন। নিজের পরের ওভারে তিনি তুলে নেন আকিম অগাস্টে ও ব্রেন্ডন কিংয়ের উইকেট। অগাস্টে (০) এলবিডব্লিউ আর কিং (১৮) হন বোল্ড। ৩৫ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তখন ক্যারিবীয়রা কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে শুরু করে।
এরপর বল হাতে যোগ দেন তানভীর ইসলাম ও রিশাদ হোসেন। তানভীর ফেরান ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক শাই হোপকে (৪), যিনি স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ তুলে দেন। রিশাদ হোসেনের ঘূর্ণিতে আরও ধসে পড়ে ক্যারিবীয় ব্যাটিং। লেগ স্পিনে তিনি ফেরান শেরফান রাদারফোর্ড (১২) ও রস্টন চেজকে (০)। ৬৩ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস। শেষ দিকে আকিল হোসেন (১৫ বলে ২৭) কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন, কিন্তু সেটি ছিল পরাজয়ের ব্যবধান কমানোর চেষ্টামাত্র। ৩০.১ ওভারে দলীয় সংগ্রহ দাঁড়ায় ১১৭ রান, এবং বাংলাদেশ পায় ১৭৯ রানের বিশাল জয়।
নাসুম আহমেদ ছিলেন অনন্য—মাত্র ১১ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন তিনি। রিশাদ ৫৪ রানে নেন ৩ উইকেট, মেহেদী মিরাজ ও তানভীর ইসলাম নেন দুটি করে। চার স্পিনারের এমন সমন্বিত পারফরম্যান্স অনেক দিন পর দেখা গেল বাংলাদেশ দলে। পুরো ইনিংসজুড়ে স্পিনাররা শুধু উইকেট নেননি, বরং প্রতিটি ওভারে নিয়ন্ত্রণ রেখে চাপ তৈরি করেছেন প্রতিপক্ষের ওপর। মিরপুরের দর্শকরা যেন একসময় গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন স্পিনের এই জাদু।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ের ব্যর্থতার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল দল। এরপর আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টানা তিনটি সিরিজে হারের পর দলটি ছিল প্রবল চাপের মধ্যে। এমন অবস্থায় এই জয় শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং মানসিকভাবে দলের পুনর্জন্মের এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের মুখে ছিল পরিপূর্ণ তৃপ্তির ছাপ। তিনি বলেন, “এই জয় পুরো দলের কঠোর পরিশ্রমের ফল। আমরা জানতাম, আমাদের সামর্থ্য আছে। আগের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করেছি এবং আজ মাঠে তার বাস্তব প্রয়োগ করতে পেরেছি। সবাই নিজেদের দায়িত্ব বুঝে খেলেছে, তাই জয় এসেছে।”
এই জয়ে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল বাংলাদেশ দল। তরুণদের পারফরম্যান্স, সিনিয়রদের দায়িত্বশীলতা এবং মিরাজের ঠাণ্ডা মাথার নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে মিরপুরের এই রাত যেন এক নবজাগরণের সূচনা। গ্যালারি ছেয়ে যায় লাল-সবুজের পতাকায়, দর্শকরা গাইতে থাকে “আমার সোনার বাংলা”—আর খেলোয়াড়রা দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে সাড়া দেন সেই উচ্ছ্বাসে।
দেড় বছরের অপেক্ষা শেষে এই জয় শুধু ক্রিকেট মাঠের এক মুহূর্ত নয়, বরং এটি এক দেশের আবেগ, পরিশ্রম ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। বাংলাদেশের ক্রিকেট আবারও দেখিয়ে দিল, তারা হারতে জানে, কিন্তু হাল ছাড়ে না। এই জয় তাই শুধুই এক দিনের সাফল্য নয়—এটি ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন আশার আলো, এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।