প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায় কর্মরত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসলাম খানের একাধিক ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এক ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি খালি গায়ে নিজ কার্যালয়ের সামনে বসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সম্বোধন করে উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি করছেন। অন্য এক ভিডিওতে, স্থানীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনের সময় গানের সুরে সুরে নিজের মাদক গ্রহণের অভ্যাসের কথা স্বীকার করছেন। এই ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মো. আসলাম খান মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার বাসিন্দা। তিনি গত ৯ অক্টোবর বান্দরবানের থানচি উপজেলা থেকে বদলি হয়ে সন্দ্বীপে যোগ দেন। যোগদানের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর এসব আচরণ স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। গানে গানে মাদক গ্রহণের কথা বলার ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন নওশাদ আকরাম নামের এক স্থানীয় সংবাদকর্মী। তিনি জানান, ২৩ অক্টোবর কিছু অভিযোগের বিষয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় অনুমতি নিয়েই ভিডিও ধারণ করা হচ্ছিল। প্রায় ২০ মিনিটের সেই সাক্ষাৎকারে অভিযোগের জবাব না দিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা নানা অসংলগ্ন কথা বলতে থাকেন, আর এক পর্যায়ে গানের সুরে বলেন, তিনি মাদক গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে, ইউএনওকে উদ্দেশ করে চিৎকার-চেঁচামেচির ভিডিওটি কখন ধারণ করা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভিডিওটি ‘সন্দ্বীপ সংযোগ’ নামের একটি ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ২২ ঘণ্টায় ভিডিওটি ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ দেখেন। মন্তব্যের ঘরে অনেকেই তীব্র সমালোচনা করেন। ফছিহুল আলম নামে একজন লিখেন, “সন্দ্বীপ উপজেলা যেন এক পুনর্বাসন কেন্দ্র।” আরেকজন, মো. আল মামুন মন্তব্য করেন, “এর থেকে মুক্তি পেতে হলে সন্দ্বীপে একটা ব্রিজ প্রয়োজন।” অন্যদিকে মোস্তফা শামীম লিখেছেন, “যখন শিক্ষা অফিসারের এই অবস্থা, তখন শিক্ষার পরিণতি অনুমান করা কঠিন নয়।”
তবে এটি প্রথম নয় যে আসলাম খান বিতর্কে জড়ালেন। বান্দরবানের থানচিতে দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিবকে মৌলিক প্রশিক্ষণের সময় গালিগালাজ করার অভিযোগে তাঁকে ১৭ জুলাই কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি তার জবাব দেননি। পরে সরকারি আদেশ অমান্য ও অসদাচরণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং পরবর্তীতে তাঁকে সন্দ্বীপে বদলি করা হয়। জানা গেছে, তাঁর কর্মজীবনে এ ধরনের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে।
নিজের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ও ভিডিওর সত্যতা স্বীকার করেছেন আসলাম খান। তিনি বলেন, “কর্মজীবনে এটি আমার ৩২তম বদলি। আমি ৮ থেকে ১০ বার বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হয়েছি। এখন এসব আমার পরম বন্ধু।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন নন এবং একে নিজের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখছেন।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ বলেন, “আমি এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” একই সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস. এম. মোসলেম উদ্দিন জানান, “উপজেলা থেকে জেলা অফিসে অভিযোগ এলে সেটি আমরা আমলে নেব। প্রয়োজনে তদন্ত হবে।”
এদিকে শিক্ষা কর্মকর্তার এমন আচরণ প্রশাসনের নীতিনৈতিকতা ও শিক্ষাপ্রশাসনের শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষক সমাজের অনেকে মনে করছেন, একজন শিক্ষা কর্মকর্তা যিনি শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয় হওয়া উচিত, তাঁর কাছ থেকে এমন আচরণ অগ্রহণযোগ্য।
সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাঁদের মতে, স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে।

ভিডিওগুলো এখনো অনলাইনে ঘুরছে, যা প্রশাসনিক সুনাম ও শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। শিক্ষা প্রশাসনের অভ্যন্তরে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতার ঘাটতিই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
একজন প্রশাসনিক বিশ্লেষক বলেন, “যদি একজন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, তাহলে সেটি পুরো ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। এই ঘটনায় প্রশাসনের ভেতর থেকে দ্রুত তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
এই মুহূর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজর এখন সন্দ্বীপের এই ঘটনাটির দিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওর ছড়িয়ে পড়া শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং পুরো সরকারি প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। জনগণ এখন অপেক্ষা করছে — শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়।









