একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের উত্তর-পূর্বের সীমান্তঘেঁষা জেলা সিলেটের হাটে-মাঠে, চায়ের দোকানে, অফিস-আদালতে শুরু হয়েছে ভোটের গরম আলাপ। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই এখন আলোচনার মূল বিষয় “কে আসবে ক্ষমতায়?”, “কাকে দেবে ভোট?”, “পাঁচ বছর পর পরিবর্তনের হাওয়া বইবে কি না?”
গত কয়েকদিন সিলেটের বিভিন্ন বাজার, হাট, অফিসপাড়া ও স্থানীয় মিলনকেন্দ্রে ‘একটি বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে করা এক নীরব মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজনৈতিক মাঠে এখন এক ধরনের নিঃশব্দ উত্তেজনা কাজ করছে। ভোটের কাউন্টডাউন যত কমছে, ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ যেন মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভোটের হাওয়া বদলাচ্ছে।
সকালের চায়ের কাপে এখন শুধু চিনি নয়, মিশে আছে রাজনীতির উত্তাপও। সিলেট নগরীর কাজলশাহ মোড়ের এক চায়ের দোকানে একদল দিনমজুর ও রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনেকেই এবার ভোটের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেবেচিন্তে এগোচ্ছেন।
রিকশাচালক রহিম আলী বলেন, “আমরা আগে নৌকায় ভোট দিতাম, কারণ মনে করতাম ওরা উন্নয়ন করে। কিন্তু এখন দেখি উন্নয়ন মানে বড়লোকের উন্নয়ন, আমাদের কিছুই আসে না।”
তার পাশেই বসা মুদি দোকানি কালাম মিয়া যোগ করলেন, “এইবার নতুন মুখ দেখতে চাই, যেই হোক—যে মানুষ সত্যি কাজ করবে, দুর্নীতি কমাবে।”
এই বক্তব্যগুলোর ভেতর দিয়ে স্পষ্ট যে, সাধারণ ভোটারের মধ্যে আগের মতো একমুখী সমর্থনের ধারা এখন আর নেই। বরং পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে ভোটের মাঠ।
সিলেটের রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতি সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে এবার দেখা যাচ্ছে, তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বাস্তবধর্মী যুক্তি তুলে ধরছে। স্থানীয় কলেজের ছাত্র রাজু আহমদ বলেন, “আমরা ধর্ম মানি, কিন্তু দেশের উন্নয়ন আর দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনও চাই। যে সরকার সৎভাবে জবাবদিহি করবে, সেই সরকারের পাশে দাঁড়ানো দরকার।”
বিশ্লেষণ বলছে, তরুণ ও প্রথমবারের ভোটাররা এবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সিলেটের মোট ভোটারের প্রায় ৩০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী—যাদের রাজনৈতিক আনুগত্য এখনও পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা ও গোলাপগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নারীদের মধ্যেও এবার ভোটের আগ্রহ অনেক বেশি। বিশেষ করে মধ্যবয়সী ও প্রবীণ নারী ভোটাররা আগের মতো “নৌকা” নির্ভরতা থেকে সরে এসে বিকল্প খুঁজছেন।
আলেমপুর গ্রামের এক বৃদ্ধা আমেনা খাতুন বলেন, “আমরা এত বছর ধরে নৌকা দিয়া গেছি, কিন্তু দেখি এখনো ঘরে ঘরে অভাব। এখন মনে হয়, একটু বদল দরকার।”
আরেকজন তরুণ গৃহিণী বলেন, “আমরা দেখি, কেউ আসে, ভোট নেয়, পরে আর দেখা যায় না। এবার যারা আসবে, তাদের কাজ দেখে ভোট দিতে চাই।”
ভোটের মাঠে এবার নতুন এক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে—চরমোনাইপন্থী ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট ভোটারদের তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, কিছু এলাকায় নৌকার ভোট ব্যাংক সরে গিয়ে এই দুটি ধারায় ভাগ হচ্ছে।
বিশেষ করে সিলেটের বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, ও জকিগঞ্জে চরমোনাই ধারার অনুসারীরা এবার মাঠে সক্রিয়। তারা গ্রামীণ মসজিদ-মাদরাসা ও হাটে প্রচার চালাচ্ছেন “ইসলামী শাসনব্যবস্থার” প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
অন্যদিকে জামায়াতের কিছু পুরনো কর্মীও গোপনে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও জামায়াতের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন নেই, তবু তাদের মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ ও প্রভাব কিছু এলাকায় এখনও টিকে আছে।
সিলেটের সিভিল সোসাইটি, শিক্ষক, ও মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের সঙ্গে কথা বললে পাওয়া যায় এক ধরনের উদ্বেগ—রাজনীতিতে অতিরিক্ত বিভাজন যেন না বাড়ে।
একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, “এবার জনগণ অনেক বেশি সচেতন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি পুরনো কৌশলেই চলে, তাহলে ভোটে অংশগ্রহণের আগ্রহে আঘাত লাগতে পারে।”
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, “জনগণ এখন রাজনীতি নয়, স্থিতিশীলতা চায়। ভোট যেন প্রতিশোধ নয়, দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে হয়।”
মাঠপর্যায়ের এই পর্যালোচনা বলছে, সিলেট এখন ‘নিরপেক্ষ বা ভাসমান ভোটার’-এর অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। আগে যেখানে একমুখী রাজনৈতিক সমর্থন দেখা যেত, এখন সেই জায়গায় এসেছে দ্বিধা ও বিশ্লেষণ।
সিলেটের ভোট যদি সত্যিই জাতীয় প্রবণতার প্রতিফলন হয়, তাহলে বোঝা যাচ্ছে—আগামী নির্বাচনে কোনো দলই এককভাবে নিশ্চিন্ত হতে পারবে না। জনগণের রায় এবার নির্ধারিত হবে ব্যক্তি, চরিত্র, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
একজন স্থানীয় বিশ্লেষক সুন্দরভাবে বললেন, “সিলেট সবসময় দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার বারোমিটার। এখানকার ভোটের হাওয়া যেদিকে বইবে, দেশের অন্য প্রান্তেও তার প্রতিধ্বনি শোনা যাবে।”
চায়ের দোকানের কাপে রাজনীতি মিশে গেছে, রিকশাওয়ালার মুখে প্রশ্ন—“ভোট দিলে কি এবার কিছু বদল হবে?” বাজারের এই সাধারণ কণ্ঠই হয়তো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ রচনার ভাষা হয়ে উঠছে।
ভোটের মাঠে সিলেট এখন এক নীরব পরিবর্তনের প্রতীক্ষায়। হাওয়া বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে, হয়তো পরের সপ্তাহেই জানা যাবে—কোন দিকে বইছে সেই হাওয়া।