প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকা: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক পরিবেশে “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” নিশ্চিত করা প্রক্রিয়া এখন উত্তেজনায় আছে। এই বিষয়টি চরিতার্থ করেছেন মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম, যিনি একাই নয়, বরং প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দল এই দাবিটি বারবার উত্থাপন করেছে। শনিবার পুরানা পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মাসিক বৈঠকে তিনি বলেন, “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অর্থ হলো, নির্বাচন পরিচালনায় যারা দায়িত্বে থাকবে—তারা সকল দলের প্রতি সমান আচরণ করবে, নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ থাকবে এবং মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের কার্যক্রম এই দৃষ্টিকোণ থেকে হতাশাজনক।”
রেজাউল করীমের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি নির্বাচন তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন প্রশাসন-নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাই একই নিয়মে কাজ করে। তিনি দাবি করেন, “মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের মানসিকতা গঠন হয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। তাই নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারকে সব দলের সঙ্গে সমান আচরণ করা উচিত।” তবে তিনি দেখছেন, পরিস্থিতি উল্টো দিকেই গড়াচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, “লন্ডনে কোনো দলের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে, জাতিসংঘের বৈঠকে তিনটি দলকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সাম্প্রতিক তিনটি দলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এই ধরনের কর্মকাণ্ড সারাদেশে এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের কাছে পক্ষপাতমূলক ধারণা বিরাজ করেছে। এতে আগামী নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
তিনি ওই বৈঠকে আরও বলেন, “দেশ নিয়ে এক অব্যাহত ষড়যন্ত্র চলছে। গতকাল‐গতশনি-রূপে ধারা-ধারায় অগ্নিকাণ্ড, ধর্ম বিষয়ক উত্তেজনা ছড়ানোর মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টাও দেখছি। এসব বিষয়ে সরকারকে সতর্ক হতে হবে, বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত করতে হবে এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।” তিনি এই প্রেক্ষাপটে পুনরায় দাবি তোলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনও কার্যকর হয়নি; দ্রুততার সঙ্গে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তফসিল ঘোষণার আগে গণভোট দিতে হবে। গণহত্যার বিচার করতে হবে, ফ্যাসিবাদের দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।”
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ (মহাসচিব), যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আশরাফুল আলম, হাফেজ মাওলানা ফজলে বারী মাসউদ, সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ইফতেখার তারিক এবং প্রচার ও দাওয়াহ্ বিষয়ক সম্পাদক হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলুল করীম মারুফ।
রেজাউল করীমের এই দাবির প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” আজ জনপ্রিয় একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। একাধিক রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যে বলেন যে, নির্বাচনের আগে জনমত, প্রশাসন, বিচার-সংস্থার ন্যায্যতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত নাও হলে, সাধারণ ভোটের মাধ্যমে দেশে সম্মাননীয় পরিবর্তন আসা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, জামায়াত‑e‑ইসলাম-এর আমীর ডঃ শফিকুর রহমান জুন ২০২৫-এ বলেছিলেন, “নির্বাচন সম্ভব roadmap অনুযায়ী, যদি ন্যায় বিচার, সংস্কার, জুলাই সনদ এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়।” আর কোম্পানি নিউ এজ-র মতে, জাতীয় পার্টি-এর এক শাখাও ২৩ অক্টোবর ২০২৫-এ দাবি করেছিল—“পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই।”
এই দাবির মূল সামঞ্জস্য হলো—যে রাজনৈতিক দল বা দলগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নেই তবে তারা বলছেন, প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশন-সহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি ও সংস্থা সত্যিকারের নিরপেক্ষভাবে কাজ করছেন না। মাঠ পর্যায়ে হয়তো নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও প্রভাবের কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়া পক্ষপাতে ধাবিত হচ্ছে বলেই তাদের বিশ্বাস। তাদের মতে, এমন অবস্থা থেকে কেউই উৎসাহী হয় না—কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব তখনই অর্থবহ হয় যখন ভোটার বিশ্বাস করতে পারে যে প্রতিদ্বন্দ্বী দল-প্রার্থীর জন্যও সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারের অভ্যন্তরীণ সংস্থাগুলো বলছেন—প্রতিটি নির্বাচনসंचালন প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কমিটি ও নির্বাচন কমিশন মানদণ্ড মেনে কাজ করছে। এই দুই-দৃষ্টিভঙ্গার মধ্যে সাধারণ ভোটাররা পড়ছেন, এবং তাদের মনোবল ও আস্থা নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” বিধান শুধু নামেকারী নয়—এটি আসলে সার্বিক নির্বাচন সংস্কার–বিচার, প্রশাসনিক স্বায়ত্বতা, বিচ্ছিন্ন ও নিরপেক্ষ মিডিয়া পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও সাধারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা জড়িত একটি জটিল বিষয়। নির্বাচনকালীন সময়ে শুধুমাত্র ভোটার উপস্থিতি বা মার্চ–র্যালি বড় নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রতি আচরণ, মামলা-হামলা-গ্রেফতারের ভাগ-বণ্টন, প্রশাসনের নির্দেশনা-মার্গদর্শকতা, নির্বাচন কমিশনের কার্যকরী স্বাধীনতা—এসব মিলিত হওয়ায়ই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়।
এই প্রসঙ্গে রেজাউল করীমের দাবি ছিল, “সরকারকে দল-নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে হলে শুধু নির্বাচনী দিন নয়—আগে-পরে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে হয়। সরকারি কর্মকর্তারা যেন নিরপেক্ষ মনোভাব পোষণ করে এবং সবাইকে উৎসাহদায়ী ভূমিকা দেবে।” তিনি জানিয়েছেন, সরকারি দৃষ্টিভঙ্গা যদি নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে এবং নির্বাচন শেষে ফলাফল যে গ্রহণযোগ্য হবে না এমন ধারণা গড়ে উঠবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বর্তমান সময়টি খুবই সংবেদনশীল। আগামী সাধারণ নির্বাচন ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হওয়া আশানুরূপ হলেও (হালনাগাদ তথ্য অনুসারে) এই নির্ধারিত তারিখও তখনই কার্যকর হবে যদি নির্বাচন প্রক্রিয়া যুক্তিসঙ্গতভাবে এগোতে পারে। যদি পূর্ববর্তী অনুসন্ধান, প্রস্তুতি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে — যেমন নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্বতা, মামলা-প্রচার-বিচার, মিছিল ও সভা-সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত বিষয় — তাহলে এসব বিষয় দ্রুত সমাধানে আসতে হবে।
একই সাথে, সাধারণ ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তারা যেন নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণের আগে মনে করি, “আমি কি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারব?” অথবা “প্রার্থীর প্রতি আমার ভোট বেশি-কমান নিয়ন্ত্রণ আছে কি না?” এই প্রশ্নগুলো তাদের ভাবনায় আসতে হবে। কারণ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হলে ভোটের ফলই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়ে।
শেষ পর্যায়ে বলা যায়, মুফতি রেজাউল করীমের কথা একটি রাজনৈতিক সংকেত। এটি শুধুই রাজনৈতিক দলের অভিযোগ নয়—অথচ এর ছায়ায় এক জাতীয় ভাবাবেগ গড়ে উঠছে যে, আগামী নির্বাচনের পরিবেশ শুধু গণতান্ত্রিক নয়, বিশ্বাসযোগ্য হওয়া জরুরি। সরকারের, নির্বাচন কমিশনের, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং সাধারণ নাগরিকদের দায়িত্ব একসাথে—যাতে নির্বাচনকালীন পরিবেশ শুধু একদিনের জন্য নিরাপদ নয়, বরং সার্বভৌম উৎসাহ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
এই সময় প্রত্যেক পক্ষের জন্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো প্রশ্ন উঠতে পারে—“সাধারণ প্রশাসন নিরপেক্ষ না ছিলো কেন?” বা “নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কারণে সীমাবদ্ধতা ছিলো কেন?” পক্ষান্তরে, বিরোধী দল বলছে—“এখানে ভিন্নমত-দমনের একটি ধাঁচ রয়েছে।” এই দুই বহুল স্বীকৃত দৃষ্টিভঙ্গার মধ্যে মিল বা বিরোধি প্রতিক্রিয়া হবে কি না, সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে একটিই স্পষ্ট—আগামী নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক হবে না, এটি সামাজিক আস্থা, প্রতিষ্ঠানগত স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হবে।
একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হয়, তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তার মূল ভিত্তি। আমি নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা করি—এই ভিত্তি যেন এই বারের নির্বাচনেই দৃঢ়ভাবে স্থাপন হয়। বরং শুধু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সঙ্গে নয়, নির্বাচনের পরিবেশ, অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতার সুযোগ ও ফল-গ্রহণযোগ্যতা-সবকিছু মিলিয়ে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়া জরুরি।