প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক লাখের বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবার ভোটের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবেন। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী আইনে সাম্প্রতিক সংস্কার অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তারা পুলিশের মতোই ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন।
তবে সেনাবাহিনীকে নির্বাচনের সময় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা বা বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে যে, নির্বাচনের সময় তাদের বিচারিক ক্ষমতা থাকা উচিত। ইতিহাসে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী বিভিন্ন নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করলেও কখনও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পাননি।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটকালীন সময় সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তাদেরকে আলাদা বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার এখতিয়ার কমিশনের নেই। নির্বাচনের সময় তারা ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ বা স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
বাংলাদেশে সেনাবাহিনী ইতিহাস ধরে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তারা মাঠ প্রশাসনকে সহায়তা করেছে। ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনে জরুরি অবস্থার সময় সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করেছিল। আর ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর সময় তাদেরকে বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
গত বছরের অগাস্টে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সেপ্টেম্বর মাসে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭টি ধারায় সেনা কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। অর্থাৎ তারা এখন সরাসরি কাউকে আটক করতে, স্বল্পমেয়াদী সাজা দিতে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে গুলি চালানোর ক্ষমতা রাখে।
সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, “সাধারণত সেনাবাহিনীর হাতে কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকলে তারা তাৎক্ষণিক বিচার করে একমাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দিতে পারেন।” নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কমিশন্ড সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। সাবেক সেনা কর্মকর্তা এমদাদুল ইসলাম বলেন, “বিচারিক ক্ষমতা পাওয়ার পর সেনাবাহিনীকে প্রশাসনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না এবং দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।”
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন থেকে সেনাবাহিনী ভোটের সময় দায়িত্ব পালন করছে। সাধারণত তারা বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করে। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োজন হয়।
তবে এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, “নির্বাচন যদি সুস্থ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রতিকূল না হয়, তবে আগে থেকেই সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।” তিনি আরও বলেন, এই ক্ষমতা থাকা মানেই সেনাবাহিনীকে অনেক বেশি কর্তৃত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা নির্বাচনের জন্য অপ্রয়োজনীয় হতে পারে।
নির্বাচন কমিশন প্রস্তাবিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করেছে, যার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে নির্বাচনের সময় অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো সেনাবাহিনীও দায়িত্ব পালন করতে পারবে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদানের বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে। নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা সরকার ছাড়া কেউ দিতে পারবে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনী এই ক্ষমতা হাতে রেখেছে। ভোটের সময় যদি তা না দেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচনের মাঠে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা হতে পারে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা এমদাদুল ইসলাম বলেন, “পুলিশের কিছু জায়গায় দুর্বলতা থাকায় ভোটের সময় সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে রাখলে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।”
নির্বাচনকে ঘিরে সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা বিষয়ে এই বিতর্ক চলছেই। পরিস্থিতি নির্ভর করবে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এবং শেষ সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন।