প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি। দেশের টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে গাজীপুরের চন্দ্রায় প্রতিষ্ঠা করেছে দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি ভাসমান বা ফ্লোটিং সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট, যার উৎপাদনক্ষমতা এক মেগাওয়াট। শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়ালটনের এই উদ্যোগ কেবল একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, বরং টেকসই শিল্পোন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
ওয়ালটন ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, শক্তি সাশ্রয়, পানি পুনঃব্যবহার ও পরিবেশ রক্ষায় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সর্বশেষ এই ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
গাজীপুরের ওয়ালটন হেডকোয়ার্টার্সের জলাশয়ের পানির ওপর ভাসমান এই সোলার প্ল্যান্ট নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে ফুড-গ্রেড নিরাপদ প্লাস্টিকের ফ্লোটিং স্ট্রাকচার, যা জলজ প্রাণী ও পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। এই প্ল্যান্ট প্রতিদিন এক মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম, যা মূলত ওয়ালটনের বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিটে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফ্যাক্টরি আংশিকভাবে বন্ধ থাকলে বা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হলে তা নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা হচ্ছে।
ওয়ালটনের এনভায়রনমেন্ট, হেলথ অ্যান্ড সেফটি বিভাগের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রাজু বলেন, “আমরা চাই আমাদের শিল্পকারখানা শুধু উৎপাদনের জায়গা না হয়ে পরিবেশ রক্ষায়ও উদাহরণ হোক। ফ্লোটিং সোলার পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে আমরা দেখাতে চেয়েছি—প্রযুক্তি, প্রকৃতি ও টেকসই উন্নয়ন একসাথে এগিয়ে যেতে পারে।”
তিনি আরও জানান, জলাশয়ের ওপর স্থাপিত এই প্ল্যান্ট কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মাছ চাষ, ভূমি সংরক্ষণ এবং পানির বাষ্পীভবন কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই উদ্যোগের ফলে শিল্পাঞ্চলে জমির চাপ অনেকটাই কমে যাবে, কারণ সৌর প্যানেল স্থাপনে অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন হয় না। একই সঙ্গে পানির ওপর স্থাপন করা প্যানেলগুলোর নিচে অক্সিজেনের ভারসাম্য বজায় থাকায় মাছের প্রজননও বাড়ে বলে জানানো হয়েছে।
ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রকল্পটি আগামী ২০ বছর পর্যন্ত কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে আরও দুটি জলাশয়ে অনুরূপ ফ্লোটিং সোলার প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার আরও সম্প্রসারিত করবে।
ওয়ালটনের এ উদ্যোগের আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বুলনপুরে ২.৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সোলার পাওয়ার প্রকল্পে ০.৮ মেগাওয়াট ফ্লোটিং সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছিল। তবে, ওয়ালটনের এক মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্প এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ভাসমান সোলার স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
ওয়ালটনের নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের ইতিহাসও উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে তাদের বিভিন্ন কারখানা ও ভবনের ছাদে, ফুটপাত এবং অন্যান্য খোলা স্থানে ১০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে ওয়ালটন বছরে ৯১১,৮২৩ মেট্রিক টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ হ্রাসে সফল হয়েছে এবং সামগ্রিক কার্বন ফুটপ্রিন্ট প্রায় ১০ শতাংশ কমাতে পেরেছে।
শুধু সৌর শক্তি নয়, পানি পুনঃব্যবহারেও প্রতিষ্ঠানটি অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। ওয়ালটনের শিল্প প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত পানি ইটিপি (Effluent Treatment Plant) এর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যার পরিমাণ মোট ব্যবহৃত পানির প্রায় ৭৫ শতাংশ।
এছাড়া, ই-বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনঃব্যবহার কার্যক্রমের মাধ্যমে ওয়ালটন পরিবেশ দূষণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার ও আপসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে নতুন সম্পদ তৈরির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়ালটনের এই উদ্যোগ কেবল একটি কর্পোরেট প্রকল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের শিল্পখাতের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে, দেশের শিল্প উৎপাদনও হতে পারে পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং প্রযুক্তিনির্ভর।