প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে ক্ষমতায় গেলে নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির ডা. শফিকুর রহমান। একইসঙ্গে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, নারী শ্রমিকদের প্রতি সমাজে সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং তাদের জন্য ন্যায্য কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এই ঘোষণা দেন।
রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় কোয়ালিশন অব বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন (কোবা) আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, “আমাদের বদনাম দেওয়া হয় যে, ক্ষমতায় গেলে আমরা নারীদের ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখব। কিন্তু আমরা তাদের কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। আমরা বিশ্বাস করি, নারীদের প্রতি ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা আমাদের ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, “মায়েরা সন্তান জন্ম দেন, তাদের লালন করেন, তবুও তারা কর্মজীবনে পুরুষদের মতো সমান সময় ব্যয় করেন। এটা ইনসাফ নয়। আমরা যদি ক্ষমতায় যাই, তাহলে নারীদের কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করা হবে। এটি কোনো দয়া নয়, বরং ন্যায্য ইনসাফ।”
ডা. শফিকুর রহমানের মতে, নারী কর্মীরা যদি সামাজিকভাবে সম্মান পান এবং সুরক্ষিত পরিবেশে কাজ করতে পারেন, তবে তারা কম সময়ে আরও বেশি দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন। তিনি বলেন, “মায়েদের প্রতি এই ইনসাফ নিশ্চিত করা হলে কর্মক্ষেত্র আরও উৎপাদনশীল ও মানবিক হয়ে উঠবে।”
অনুষ্ঠানে জামায়াত আমির বিশেষভাবে বাংলাদেশের পোশাক খাতের নারীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “দেশে প্রায় ৭০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক রয়েছে, যার ৯০ শতাংশই নারী। তারা শালীন পোশাকে প্রতিদিন কাজের জায়গায় যান। তারা নিজের ইজ্জত রক্ষার জন্যই এই পোশাক বেছে নিয়েছেন, কাউকে খুশি করার জন্য নয়। আমাদের সমাজের দায়িত্ব তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেওয়া।”
তার বক্তব্যে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও নারীর কর্মঅংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “রাসুল (সা.)-এর সময়েও নারীরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, আহতদের সেবা করেছেন, পানি সরবরাহ করেছেন। যখন যুদ্ধের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় নারী অংশ নিতে পারেন, তখন সমাজের অন্য কোনো কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণে বাধা থাকার কথা নয়।”
তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে নারীদের চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে নীতিগত পরিবর্তন আনবে। একইসঙ্গে কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন সেবা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং শিশু যত্নকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর ঘোষণা ছাড়াও জামায়াত আমির তার বক্তৃতায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দুর্নীতি, ন্যায়বিচার ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমাদের বড় অঙ্গীকার হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই। আমরা এমন একটি সমাজ চাই যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান থাকবে। কোনো দলের বা ব্যক্তির স্বার্থ নয়, ন্যায়বিচারই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জুলাই বিপ্লবে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা চেষ্টা করে যাব তাদের আদর্শে একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে। আমরা মজলুমের দল— তাই মজলুম বাংলাদেশের স্বপ্নেই আমাদের সংগ্রাম।”
বিচার ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা হত্যার বিচার চেয়েছি, বিচার শুরু হয়েছে। আমরা জানি, এই সরকারের মেয়াদে সব হত্যার বিচার সম্পন্ন হবে না। কিন্তু সরকারের বিদায়ের আগে কয়েকটি বিচার শেষ হলে জাতির আস্থা কিছুটা ফিরে আসবে। ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদেরও এই বিচারের ন্যায়ভিত্তিক সমাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
নিউইয়র্কে আয়োজিত এ সংবর্ধনায় জামায়াত আমির প্রবাসীদের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আমরা প্রবাসীদের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করেছি। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। আপনারা ইনটেলিজেন্ট রেমিট্যান্স পাঠান— এমনভাবে অর্থ পাঠান, যাতে তা দেশের উন্নয়ন ও শিক্ষা খাতে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়।”
তিনি প্রবাসীদের উদ্দেশে বলেন, “আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। অথচ আমাদের মেধাবীরা বিদেশে গিয়ে সম্মান অর্জন করছে। আমরা চাই, আপনারা দেশের উন্নয়নে অংশ নিন, নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে জাতিকে উপকৃত করুন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা আলাদীনের প্রদীপ হাতে পাইনি। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে, জনগণের ভালোবাসা থাকলে পাঁচ বছরের মধ্যেই আমরা জাতিকে দুর্নীতি ও অনিয়ম থেকে মুক্ত করতে পারব। তখন মানুষ বাংলাদেশি পরিচয়ে গর্ববোধ করবে, আর প্রবাসী প্রত্যেকে হবেন দেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর।”
এছাড়া প্রবাসীদের প্রতি জামায়াত আমিরের আহ্বানকে রাজনৈতিক তহবিল ও নীতিগত সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
তবে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর ঘোষণার বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে ইতিবাচক ও সমালোচনামূলক উভয় প্রতিক্রিয়াই দেখা গেছে। কেউ কেউ একে “নারীবান্ধব উদ্যোগ” হিসেবে প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ বলছেন, “এটি আধুনিক কর্মসংস্থানের বাস্তবতায় অবাস্তব ও বৈষম্যমূলক।”
সভায় সভাপতিত্ব করেন কোবা’র চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া। উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের যুক্তরাষ্ট্র শাখার মুখপাত্র ডা. নাকিবুর রহমান, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান, শিক্ষাবিদ আবু আহমেদ নুরুজ্জামান প্রমুখ।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, দলটি এখন নিজেদের ধর্মীয় ভাবমূর্তি বজায় রেখে রাজনৈতিকভাবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণের চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, “ন্যায় ও সত্যের পথে কেউ না এলেও, আমরা আমাদের মজলুম কাফেলা নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগিয়ে যাব।”