প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলাকে দেশের ৬৫তম জেলা ঘোষণার দাবিতে সোমবার সকাল থেকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো ভৈরব শহর। দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে স্থানীয় জনগণ রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভে নামে। বিক্ষোভ চলাকালে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে আটকে থাকা যাত্রীবাহী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনে বৃষ্টির মতো পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে রেলওয়ের দুই কর্মচারীসহ কয়েকজন যাত্রী আহত হন।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার সকাল ১০টার দিকে। বিক্ষোভকারীরা রেলস্টেশনে ঢাকাগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেন থামিয়ে দেয় এবং প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে রেল চলাচল বন্ধ রাখে। ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহগামী ট্রেনগুলো বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। এতে শত শত যাত্রী, বিশেষ করে বিদেশগামী যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর, সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয় এবং উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রেল অবরোধের সময় আন্দোলনকারীরা হাতে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে “ভৈরব জেলা চাই”, “প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়ন করো” ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। তারা দাবি করেন, ভৈরবের দীর্ঘদিনের এই আন্দোলন আর উপেক্ষা করা যাবে না। বিক্ষোভ চলাকালে হঠাৎ একদল উত্তেজিত যুবক ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করে, এতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রেলওয়ের কর্মীরা ও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও কয়েকজন আহত হন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ভৈরববাসীর জেলা ঘোষণার দাবি নতুন নয়। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ভৈরবকে জেলা ঘোষণা করেছিলেন। একই বছরের অক্টোবরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী, বাজিতপুর, অষ্টগ্রাম ও কুলিয়ারচর উপজেলাকে যুক্ত করে ভৈরবকে দেশের ৬৫তম জেলা হিসেবে ঘোষণা দেয়। কিন্তু তৎকালীন কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রজ্ঞাপনটি কার্যকর হয়নি।
আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, এরপর থেকে একাধিকবার জেলা ঘোষণার প্রতিশ্রুতি এলেও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। স্থানীয়রা মনে করেন, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প এলাকা এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিচারে ভৈরব একটি পূর্ণাঙ্গ জেলার যোগ্যতা বহন করে।
সোমবারের কর্মসূচিতে ভৈরব উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। তারা সাধারণ মানুষের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জানান, ভৈরবকে জেলা ঘোষণা না করা হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আন্দোলনে অংশ নেন স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও।
অবরোধ চলাকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট রেলপথ সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে পড়ে। ভৈরব রেলস্টেশন ও আশপাশের এলাকায় শত শত যাত্রী আটকা পড়ে। ট্রেনের জানালা ও কাচে পাথর লাগায় কয়েকটি কোচের ক্ষতি হয়। অনেক যাত্রী জানালা বন্ধ করে ভিতরে বসে আতঙ্কে অপেক্ষা করতে থাকেন। রেলওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে রেল চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালায়।
রেলওয়ে পুলিশের সদস্যরা জানান, ঘটনাস্থল থেকে কেউ আটক না হলেও তদন্ত শুরু হয়েছে। রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইয়িদ আহম্মেদ বলেন, “বর্তমানে রেল চলাচল স্বাভাবিক আছে। কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।”
রবিবারও একই দাবিতে ভৈরববাসী ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুর্জয় মোড় এলাকায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। সোমবার রেলপথ অবরোধের পর আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, মঙ্গলবার নৌপথ অবরোধ করা হবে। তারা হুঁশিয়ারি দেন, যদি দ্রুত ভৈরবকে জেলা ঘোষণা না করা হয়, তাহলে পরবর্তীতে সড়ক, রেল ও নৌপথ একযোগে অবরোধ করা হবে।
একজন আন্দোলনকারী বলেন, “আমাদের দাবি কোনো রাজনৈতিক নয়, এটা মানুষের ন্যায্য অধিকার। প্রশাসন ও সরকারের কাছে অনুরোধ, প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়ন করুন, অন্যথায় আমরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাব।”
ভৈরব বর্তমানে দেশের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর হিসেবে পরিচিত। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে জংশনগুলোর একটি, পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং ভৌগোলিক বিচারে এটি কিশোরগঞ্জ জেলার অন্যান্য উপজেলার তুলনায় অনেক এগিয়ে। এজন্য স্থানীয়রা মনে করেন, ভৈরবকে জেলা ঘোষণা করলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক ফোরাম একযোগে বলছে, “ভৈরব এখন কেবল একটি উপজেলা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এর শিল্পকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসংখ্যার ঘনত্বই প্রমাণ করে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হওয়ার যোগ্য।”
সোমবারের ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা চলছে এবং পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি ও উত্তেজনা এখনও প্রশমিত হয়নি। আন্দোলনকারীরা পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা না পাওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
একজন স্থানীয় প্রবীণ নাগরিক বলেন, “ভৈরবের মানুষ শান্তিপ্রিয়, কিন্তু ন্যায্য দাবির জন্য তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে। সরকার যদি জনগণের কণ্ঠ শুনে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এই আন্দোলনের কোনো প্রয়োজন হতো না।”
পরিস্থিতি আপাতত স্বাভাবিক হলেও প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন কোনো অস্থিতিশীলতা আর না ঘটে।