প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাজ্য বিএনপিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার আগেই সংগঠনটিতে নতুন কমিটি গঠনের দাবিতে সরব হয়েছেন যুক্তরাজ্যে থাকা দলটির একাংশ। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একই নেতৃত্বে পরিচালিত এই শাখায় এখন কাঙ্ক্ষিত পুনর্গঠনের সময় এসেছে বলে মনে করছেন অনেক সিনিয়র ও তরুণ নেতা।
২০১৯ সালে গঠিত যুক্তরাজ্য বিএনপির বর্তমান কমিটির মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে অনেক আগেই। সভাপতি এম এ মালিক ও সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তারা দুজনই দেশে অবস্থান করছেন এবং দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এ অবস্থায় লন্ডনভিত্তিক নেতাকর্মীদের মধ্যে নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্য বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে ইতোমধ্যে কয়েকজন নেতার নাম বিবেচনায় নিয়েছেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে তারেক রহমানের অনুমোদনের পরই।
দলের অভ্যন্তরে যে নামগুলো এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তার মধ্যে সভাপতি পদে রয়েছেন আকতার হোসেন টুটুল, প্রফেসর মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, তাজুল ইসলাম ও আকতার হোসেন। আর সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য আলোচনায় আছেন পারভেজ মল্লিক, খসরুজ্জামান খসরু, ড. মুজিবুর রহমান মুজিব, শহিদুল ইসলাম মামুন, ব্যারিস্টার মওদুদ এবং নাসিম আহমদ। দলীয় অভ্যন্তরে এসব নাম নিয়ে তীব্র লবিং চলছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন নেতাকর্মী।
যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি এলাকায় মানুষের সেবার জন্য দেশে এসেছি, তবে আমার কিছু সাংগঠনিক দায়িত্ব আছে। যুক্তরাজ্যে বিএনপির মোট ৬৫টি ইউনিট রয়েছে, প্রতিটি ইউনিট থেকে আমি সদস্যপদ সংগ্রহ করেছি। প্রত্যেক ইউনিট থেকে দুই শতাধিক সদস্যের তালিকা হাতে এসেছে। আমার পরিকল্পনা ছিল, প্রতিটি ইউনিটে একটি করে সুপার ফাইভ কমিটি গঠন করা, যাতে গণতান্ত্রিক উপায়ে নেতৃত্ব নির্বাচন সম্ভব হয়।”
তিনি আরও বলেন, “দল যদি অনুমতি দেয়, তাহলে আমি প্রথমেই যুক্তরাজ্যের ইউনিটগুলোতে নতুন কমিটি গঠনের কাজ শুরু করবো। এরপর সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে সভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত করা হবে। এটি হবে একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।”
বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে নতুন নেতৃত্ব না আসায় যুক্তরাজ্যে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। লন্ডনে অবস্থানরত একাধিক নেতার মতে, কেন্দ্রীয় দিকনির্দেশনার অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের অনুপস্থিতি সংগঠনকে দুর্বল করে ফেলেছে। অনেকেই মনে করছেন, নতুন কমিটি হলে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবেন এবং বিদেশে বিএনপির কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে।
দলীয় একটি সূত্র জানায়, তারেক রহমান আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা নিয়ে যুক্তরাজ্য বিএনপিতে উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তার ফেরার আগে সংগঠনটি নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে চায় তারা। তাই নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।
একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “গত কয়েক বছরে যুক্তরাজ্য বিএনপি অনেক বিভক্ত হয়েছে। আগের মতো একতা আর নেই। সবাই এখন চায়, নতুন নেতৃত্ব আসুক, যারা সবাইকে নিয়ে কাজ করবে। এটি শুধু কমিটি পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং একটি নতুন সূচনা হতে পারে।”
অন্যদিকে বর্তমান কমিটির সমর্থকরা বলছেন, এম এ মালিক ও কয়ছর আহমেদ বিএনপির কঠিন সময়েও বিদেশে দলকে সংগঠিত রেখেছেন। তাদের নেতৃত্বে দল লন্ডনে বিভিন্ন আন্দোলন ও মানববন্ধনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তাই নতুন কমিটি গঠনের আগে তাদের অবদানও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাজ্য বিএনপি সবসময়ই কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এর ইতিহাসও তা-ই বলে। দেশে যখনই রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নির্বাচন ঘনিয়ে আসে, তখন যুক্তরাজ্য বিএনপির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, এখান থেকেই অনেক কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও প্রচারণার দিকনির্দেশনা যায়। তাই নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে যে নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা আসলে একটি বড় রাজনৈতিক প্রস্তুতির অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন কমিটিতে তরুণ নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। এর মাধ্যমে দল সংগঠনে নতুন উদ্যম আনতে চায়। তবে অভিজ্ঞ সিনিয়র নেতাদেরও পরামর্শদাতা হিসেবে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমান সভাপতি এম এ মালিক বলেছেন, “আমি যেহেতু দেশে রাজনীতিতে সক্রিয় এবং আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করছি, তাই যুক্তরাজ্যের দায়িত্ব নতুন নেতৃত্বের কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত আছি। তবে আমি দেশে থেকেও দলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবো।”
অন্যদিকে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, যুক্তরাজ্য বিএনপির পুনর্গঠন শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয় নয়, এটি আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ। বিদেশে থাকা প্রবাসী সমর্থকদের সংগঠিত করা, আন্তর্জাতিক লবিং জোরদার করা এবং রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া—এসব ক্ষেত্রেই যুক্তরাজ্য বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন।
দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, লন্ডন ছাড়াও বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো ও লিভারপুলের নেতারা নতুন কমিটি গঠনের ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন। অনেকে চেয়েছেন, প্রবাসে যারা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির হয়ে কাজ করছেন, তাদেরই নেতৃত্বে আনা হোক, যাতে তৃণমূলের আস্থা ফিরে আসে।
সবমিলিয়ে যুক্তরাজ্য বিএনপি এখন অপেক্ষায় রয়েছে তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের। নতুন কমিটি গঠনের পর সংগঠনে কতটা পরিবর্তন আসে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে স্পষ্টতই বলা যায়—বিএনপির বিদেশি শাখাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এই ইউনিটে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, যার প্রভাব পড়বে মূল দলের রাজনীতিতেও।