প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢালিউডের কিংবদন্তি নায়ক সালমান শাহর মৃত্যু রহস্যের ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও তার মৃত্যু মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটন এলাকায় নিজের ফ্ল্যাটে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় সালমান শাহর। তৎকালীন সময়ে পলিসি ও পুলিশের তদন্তে তার মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, সালমান শাহর পরিবারের অনুরোধে নতুন করে হত্যা মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। ২০২১ সালে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বিভিন্ন তদন্তের পর আদালত অবশেষে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।
সালমান শাহর মামা ও চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর হোসেন কুমকুম ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে মোট ১১ জনকে, যার মধ্যে আছে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, শাশুড়ি লতিফা হক লুছি, বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বাংলা চলচ্চিত্রের খলনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল হক ওরফে ডন। এছাড়া মামলায় আরও অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মামলায় নাম উল্লেখ করা অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ডেভিড, জাভেদ ও ফারুক, যাদের ঠিকানা রাজধানীর বিএফডিসি দেওয়া হয়েছে। আরও চারজন আসামি হলেন ফরিদপুরের রেজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ, রুবী, আ. ছাত্তার এবং সাজু। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এইসব আসামির বর্তমান অবস্থান স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
মামলার তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ১৩ অক্টোবর আদালতে এ মামলায় প্রথম উপস্থিত ছিলেন সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক। এক সপ্তাহের মধ্যেই আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় মামলা দায়ের হয়। তদন্তকারীরা আশা করছেন, আদালতের এই নির্দেশনা আসামিদের স্থিতি স্পষ্ট করতে সাহায্য করবে। কিন্তু, মামলার দায়েরের পরপরই বেশ কিছু আসামি গা ঢাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বিশেষ করে ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই অনেকদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এছাড়া আসামি রেজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন। সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুছি এবং অপর আসামি ডন দেশে অবস্থান করলেও মামলার দায়েরের পর তাদের whereabouts অজানা।
মামলার তদন্ত কার্যক্রমটি শুরু হয়েছিল রমনা থানার এসআই মাহবুবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে। পরবর্তীতে মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে দুই কর্মকর্তা—সহকারী পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবীর এবং এএসপি মো. মজিবুর রহমান—পর্যায়ক্রমে তদন্ত পরিচালনা করেন। এরপর মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তরিত হয়। সেখানকার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এএসপি খালেক-উজ-জামান।
মামলার আরও এক পর্যায়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলাটির দায়িত্ব গ্রহণ করে। পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ইন্সপেক্টর মো. সিরাজুল ইসলাম বাবুল, তদারকি কর্মকর্তা ছিলেন পিবিআইর পুলিশ সুপার শফিউল আজম ও বশির আহমেদ। প্রতিটি সংস্থার প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় জুডিসিয়াল তদন্তও করা হয়েছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) কোর্টের বিচারক ইমদাদুল হক মামলাটির বিচারিক তদন্ত পরিচালনা করেন। সেখানেও একই চিত্র উঠে আসে। কিন্তু সালমান শাহর পরিবার ও চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মীরা এখনও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। এই কারণেই আদালত হত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত করার নির্দেশ দেন।
২১ অক্টোবর মামলা দায়েরের পর রমনা থানার ইন্সপেক্টর আতিকুল আলম খান্দকারকে মামলার নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি জানান, “নতুন করে মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “আসামিরা দেশে আছেন নাকি বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তা জানলে নিশ্চয়ই ধরেই ফেলতাম। তাদের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। যাতে তারা দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে না পারে, সে কারণে ইমিগ্রেশনে মামলার তথ্য পাঠানো হয়েছে।”
এই হত্যাকাণ্ড ও মামলার তদন্ত শুধু ঢালিউডের জন্যই নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সালমান শাহ ছিলেন ঢালিউডের একজন কিংবদন্তি নায়ক, যার মৃত্যু এখনও চলচ্চিত্রপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। তার মৃত্যুর পর থেকে চলচ্চিত্রের নানা অঙ্গনে এই ঘটনায় আলোচনা চলছেই। হত্যার বিষয়টি আদালত ও তদন্ত সংস্থাগুলো পর্যন্ত গড়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত, সালমান শাহের মৃত্যুর পর চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মীরা অনেক বছর ধরে বিচার চেয়েছেন। সালমান শাহর পরিবারও এই মামলার পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। হত্যা মামলার পুনরায় কার্যক্রম শুরু হওয়ায় আশা করা হচ্ছে, দীর্ঘ দিনের রহস্য ধীরে ধীরে সমাধান হবে। এই মামলা শুধুমাত্র একজন নায়কের মৃত্যু তদন্তের বিষয় নয়, এটি পুরো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বকেও স্পর্শ করছে।
বর্তমানে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করতে চাইছেন, সব আসামি যেন দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে না পারে এবং আইনের আওতায় আসে। সাম্প্রতিক সময়ে আসামিদের whereabouts সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও, পুলিশের নজরদারি এবং তদন্ত কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে। এতে আসামিদের দমন ও তদন্তে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সালমান শাহ হত্যা মামলা ঢালিউডের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ, জটিল এবং রহস্যময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। আসামিদের অবস্থান, তদন্তের পরবর্তী ধাপ এবং আদালতের নির্দেশনার আলোকে বলা যায়, মামলাটি বর্তমানে নতুন করে গতি পেয়েছে। চলচ্চিত্র প্রেমী এবং সাধারণ জনগণ আশা করছেন, আদালত এবং তদন্ত সংস্থাগুলো যথাযথভাবে কাজ করলে সত্য উদঘাটিত হবে এবং দীর্ঘদিনের রহস্যের পরিপূর্ণ সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে।