প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় চেতনানাশক ছিটিয়ে একটি পরিবারকে অজ্ঞান করে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) ভোররাতে উপজেলার চরকিং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লা বাড়িতে এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে এবং এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হাতিয়া সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী ইনসাফ বস্ত্র বিতানের মালিক কামরুল ইসলামের বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। রাতের কোনো এক সময় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা বাড়ির জানালার টিনের অংশ খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর তারা পরিবারের সদস্যদের শয়নকক্ষে চেতনানাশক পদার্থ ছিটিয়ে সবাইকে গভীর অচেতনে ফেলে দেয়। বাড়ির ভেতরে কেউ টের পাওয়ার আগেই দুর্বৃত্তরা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে পালিয়ে যায়।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, লুট হওয়া মালামালের মধ্যে রয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা নগদ অর্থ, নয় ভরি স্বর্ণালংকার, দুটি স্মার্টফোন এবং অন্যান্য গৃহস্থালির মূল্যবান সামগ্রী—মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা। সকালে পরিবারের লোকজন জ্ঞান ফিরে আসার পর দেখা যায়, ঘরের আলমারি ভাঙা, বিছানার নিচে এবং টেবিলের ড্রয়ারগুলো এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে।
ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, “সেদিন আমি অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে গিয়ে রাতের দিকে বাড়িতে ফিরি। বাড়িতে ফিরে কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোরে হঠাৎ মেয়ের চিৎকারে ঘুম ভাঙে। দেখি পুরো ঘর তছনছ করা, স্ত্রী, ছেলে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জাগানোর চেষ্টা করলেও কেউ সাড়া দিচ্ছে না। তখনই বুঝতে পারি, চেতনানাশক ছিটিয়ে অজ্ঞান করে দুর্বৃত্তরা সব নিয়ে গেছে। পরে প্রতিবেশীরা এসে আমাদের উদ্ধার করে।”
তিনি আরও জানান, স্ত্রীর গহনা, ব্যবসার টাকার কিছু অংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও চুরি গেছে। “এমন ঘটনায় মানসিকভাবে আমরা ভীষণ ভেঙে পড়েছি। এখনো সন্তানরা আতঙ্কে আছে। ঘুমাতে ভয় পাচ্ছে,” বলেন তিনি।
ঘটনার পর স্থানীয়রা দ্রুত পুলিশকে খবর দেয়। হাতিয়া থানা পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ করে এবং তদন্ত শুরু করে। হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম আজমল হুদা বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি। ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত চুরি বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
ওসি আরও বলেন, “চেতনানাশক ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হতে আমরা ঘরের বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছি। ফরেনসিক রিপোর্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে কী ধরণের পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।”
এদিকে, ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্প্রতি হাতিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে এমন অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা বেড়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। চরকিং, জাহাজমারা ও নিঝুমদ্বীপ এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত কয়েক মাসে একই কায়দায় অন্তত চারটি চুরির ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়নি।
চরকিং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ছালেহ উদ্দিন বলেন, “এভাবে চেতনানাশক ছিটিয়ে মানুষ অজ্ঞান করে চুরি করার ঘটনা আমাদের এলাকায় এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে বারবার নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে আসছি। বিশেষ করে ফেরিঘাট, বাজার এলাকা ও গ্রামীণ সংযোগ সড়কে পুলিশের টহল বাড়ানো দরকার।”
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা রাতে ঘুমাতে ভয় পাই। গ্রামের মানুষ এখন তালা-চাবি দিয়ে বসেও নিরাপদ নয়। পুলিশ যদি দ্রুত এই চক্রকে ধরতে না পারে, তাহলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হবে।”
এদিকে, হাতিয়া উপজেলা প্রশাসনও ঘটনাটির ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন জাহান বলেন, “এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানতে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহায়তায় চেতনানাশক পদার্থের উৎস খুঁজে বের করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “চেতনানাশক পার্টির সদস্যরা সাধারণত বড় বাজার ও ফেরিঘাট এলাকাগুলোতে অবস্থান নেয়। তারা সুযোগ বুঝে ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষের বাড়িতে প্রবেশ করে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে। জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে এবং সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই পুলিশকে খবর দিতে হবে।”
পুলিশ জানায়, এ ঘটনার সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। এই চক্র পূর্বে নোয়াখালী সদর, সুবর্ণচর এবং লক্ষ্মীপুরের কিছু এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের ধরতে ডিবি পুলিশ ও থানা পুলিশের যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “অজ্ঞান পার্টি এখন গ্রামেও পৌঁছে গেছে। মানুষ ঘরেও নিরাপদ নয়।” কেউ কেউ প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেছেন, “চেতনানাশক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান হচ্ছে কেবল শহরে, কিন্তু গ্রামের মানুষ অসহায়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চেতনানাশক পার্টির এসব অপরাধকে কেবল সাধারণ চুরি বলে অবহেলা করলে বিপদ আরও বাড়বে। কারণ এ ধরনের অপরাধে চেতনানাশক পদার্থের মাত্রা বেড়ে গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে। অতীতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চেতনানাশক প্রয়োগে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এমন অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল, সন্দেহভাজনদের নজরদারি এবং ফরেনসিক তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করলেই এ ধরনের অপরাধ দমন করা সম্ভব।
বর্তমানে হাতিয়া থানার পুলিশ পুরো এলাকাজুড়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, লুট হওয়া স্বর্ণালংকারগুলো স্থানীয় জুয়েলারি দোকানে বিক্রির কোনো চেষ্টা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সন্দেহভাজনদের ছবি ও তথ্য স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে ব্যবসায়ী কামরুল ইসলামের পরিবার এখনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিনি বলেন, “আমাদের যা ছিল সব নিয়ে গেছে। এখন কেবল ভয় আর অনিশ্চয়তা। আশা করি, পুলিশ দ্রুত অপরাধীদের ধরবে।”
এ ঘটনায় হাতিয়ার সাধারণ মানুষ প্রশাসনের প্রতি আস্থা রাখলেও নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবিতে সরব হয়েছে। অনেকেই বলছেন, “হাতিয়া দ্বীপ হওয়ায় এখানে পালানোর পথ কম, কিন্তু আইন প্রয়োগেরও সীমাবদ্ধতা আছে। তাই দ্রুত নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও থানা পুলিশের যৌথ টহল চালু করা দরকার।”
বর্তমানে পুলিশ ঘটনাটিকে গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা আশাবাদী, প্রশাসন দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনবে। তবে এই ঘটনার পর দ্বীপবাসীর মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—রাতের অন্ধকারে চেতনানাশক ছিটিয়ে ঘরে প্রবেশ করা সেই অজানা চক্র আবার কবে আঘাত হানবে না তো?
হাতিয়ার শান্ত দ্বীপজীবনে ভয় ও অস্থিরতার এই ছায়া যতদিন না অপরাধীরা ধরা পড়ছে, ততদিন স্থানীয়দের চোখে ঘুম আসবে না বলেই মনে করছেন অনেকেই।