সরকারি হারভেস্টার মেশিন বিতরণে কোটি টাকার লোপাটের অভিযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
লক্ষ্মীপুরে সরকারি হারভেস্টার মেশিন বিতরণে কোটি টাকার লোপাটের অভিযোগ

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় সরকারি ভর্তুকি পাওয়া হারভেস্টার মেশিন ও তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক সেবা ডিজিটাল সেন্টারের টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৮নং দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চরলক্ষ্মী, চরকাচিয়া ও কানিবগা ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি উপসহকারী আখতার হোসেন সরকারি বরাদ্দকৃত মেশিন ও অর্থের ব্যাপক অনিয়ম করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি দুটি হারভেস্টার মেশিন এবং ডিজিটাল কৃষক সেবা সেন্টারের সরকারি ভর্তুকির প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

স্থানীয় কৃষক ও সূত্রের তথ্যে জানা যায়, রায়পুর উপজেলায় মোট ২০টি হারভেস্টার মেশিন বিতরণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে উপসহকারীরা কোটি টাকারও বেশি টাকা লোপাট করেছেন। শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, তথ্য সংগ্রহ ও কার্যক্রমে ফাঁকি দেওয়া, সরকারি নিয়মাবলী অমান্য এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, আখতার হোসেন ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য এবং অতীতেও বিভিন্ন অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। তার উপর স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনে এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।

কৃষক ও স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, আখতার হোসেন তার ভাগিনা ইব্রাহীম গাজী এবং জহিরুল ইসলাম নামে দুইটি হারভেস্টার মেশিন এনে তা অন্য এলাকায় নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এই দুটি মেশিনের জন্য সরকার প্রায় ৩২ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। কিন্তু মেশিন কোথায় এবং কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা স্থানীয় কৃষকরা জানেন না। এছাড়াও বরাদ্দকৃত প্রণোদনার অধিকাংশই তার স্বজনদের নামে ব্যবহার করা হয়েছে।

২০১৫ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমান সরকার তৃণমূল পর্যায়ে কৃষক সেবা ডিজিটাল সেন্টারের জন্য ৫ লাখ টাকা প্রণোদনা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই ডিজিটাল সেন্টারও আখতার হোসেন তার ছোট ভাইয়ের নামে চালু করেছেন এবং নিজে সরকারি ডিউটি এড়িয়ে সেখানে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছেন। এতে সরকারি সুবিধা শুধুমাত্র তার স্বজনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে এবং সাধারণ কৃষক এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ভারতে পালানোর পথে ‘আজিজুল ইসলাম আজিজ’ : শামীম ওসমানের সহযোগী গ্রেপ্তার

২নং উত্তর চরবংশীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি উপসহকারী মো. মনির হোসেন সাংবাদিকদের জানান, তিনি তার দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও এই সেন্টার ও মেশিন বরাদ্দ সম্পর্কে কিছু জানেন না। “উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আখতার হোসেনের সঙ্গে পরামর্শ করে তার ছোট ভাইকে সেন্টারের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি কোনো কিছু বলতে পারি না, কারণ আমার কোনো কথা শোনা হয়নি,” তিনি বলেন।

তথ্য অনুসন্ধান ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারি ভর্তুকির অধিকাংশ হারভেস্টার মেশিনই স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। উপসহকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা ও তদারকির অভাবে অনেক মেশিন বর্তমানে অচল। সচল থাকা মেশিনগুলোও সরকারি শর্ত ভঙ্গ করে বিক্রি করা হয়েছে এবং স্থানীয় সুবিধাভোগীরা এগুলো ব্যবহার করছেন। এতে সরকারের কোটি টাকার সম্পদ লোপাট হয়েছে।

রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাজেদুল ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় প্রথমে কোনো তথ্য দিতে চাননি। তিনি বলেন, “তথ্য দিয়ে কী হবে? আপনারা সুবিধা চাইলে বরাদ্দ দেবো, আর ঘাঁটাঘাঁটি না করুন। সবসময় বিজি থাকি।” তিনি আরও যোগ করেন, অভিযুক্তদের ইউনিয়ন বদল করে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কৃষি খাতে এই ধরনের অনিয়ম শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বরং কৃষকদের সেবার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে। ভর্তুকি ও সরকারি যন্ত্রপাতি সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো উচিত। কিন্তু স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও তদারকির অভাবে সরকারি প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। এই ধরনের অনিয়ম সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

লক্ষ্মীপুরের কৃষকরা বলেন, সরকারি মেশিন ও প্রণোদনা তাদের কৃষি কার্যক্রম সহজ করার জন্য বরাদ্দ করা হলেও প্রকৃত ব্যবহারকারীরা তাতে পৌঁছাচ্ছেন না। ফলে ক্ষতি হচ্ছে শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৃষি উৎপাদন ও কার্যকারিতার ক্ষেত্রেও। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, স্থানীয় প্রশাসন ও উচ্চতর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের অনিয়ম দীর্ঘমেয়াদে সরকারি প্রকল্প ও কৃষি উন্নয়নে আস্থা হ্রাস করতে পারে। কৃষকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে সরবরাহ ও তদারকিতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, তথ্যপ্রাপ্তি সহজীকরণ এবং স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলেন, সরকারি যন্ত্রপাতি সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানো ও নিয়মিত তদারকি করলে অর্থ ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।

রায়পুর উপজেলার এই ঘটনা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি প্রকল্প ও ভর্তুকি বিতরণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অনিয়মের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এই ধরনের অভিযোগ তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং কৃষকের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি সামিরা ও ডনের খোঁজ মিলছে না

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভর্তুকি প্রাপ্ত হারভেস্টার মেশিন ও ডিজিটাল কৃষক সেবা সেন্টারগুলোর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কৃষক উপকৃত হওয়ার কথা। কিন্তু স্থানীয় স্তরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে প্রকৃত ফলাফল প্রভাবিত হচ্ছে। এই অবস্থা দ্রুত নিরসন করা না হলে, শুধু ক্ষতি হবে অর্থনৈতিক, বরং কৃষি উৎপাদন ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত