প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, ঢাকা ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাডের আঘাতে নিহত আবুল কালাম আজাদের পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এ নোটিশে ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি কালামের পরিবারের একজন সদস্যকে মেট্রোরেলে স্থায়ী চাকরি দেওয়ার দাবিও করা হয়েছে। আইনজীবী এনামুল হক নবীন মঙ্গলবার এই লিগ্যাল নোটিশ ডাকযোগে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব/সিনিয়র সচিব এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠান।
আইনি নোটিশে বলা হয়, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে এবং কালামের পরিবারের একজনকে মেট্রোরেলে স্থায়ী চাকরি দিতে হবে। অন্যথায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই নোটিশটি ঢাকার মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের প্রতি পরিবারের পক্ষ থেকে সরাসরি দাবি ও চাপ হিসেবে পরিগণিত হবে।
নোটিশে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়, গত ২৬ অক্টোবর ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের এমআরটি লাইন-৬ ফার্মগেট মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন পিয়ার নম্বর ৪৩৩ থেকে দুটি বিয়ারিং প্যাড পড়ে যায়। এর মধ্যে একটি প্যাড পথচারী আবুল কালাম আজাদের মাথায় আঘাত করলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নিহত আবুল কালাম তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি ছিলেন। তার স্ত্রী এবং দুই শিশু সন্তান রয়েছে। এছাড়াও তার ছোট ভাই শিক্ষাজীবন পরিচালনার জন্য আবুল কালামের আর্থিক সহায়তায় নির্ভরশীল ছিলেন।
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের ব্যবস্থাপনা ও নির্মাণ সংক্রান্ত চরম গাফিলতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ তাদের স্থাপনা এবং সরঞ্জামাদি যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করেনি। কোথায় এবং কখন কী ধরনের ত্রুটি রয়েছে তা পূর্বেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে ত্রুটিযুক্ত অবস্থায় মেট্রোরেল পরিচালনা করা হয়েছে, যা জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয় যে, ঘটনার পর মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ২৭ অক্টোবর মাত্র পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং কালামের পরিবারের একজনকে চাকরি দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। পরিবার এবং তাদের আইনজীবী এই প্রস্তাবকে “সামান্য, বাস্তবতা বিবর্জিত, অস্পষ্ট এবং অবমাননাকর” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মৃত্যুবরণকারী আবুল কালামের পরিবারের জীবনযাত্রা চালানো এবং তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন আরও বড় এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা প্রয়োজন।
আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ক্ষতিপূরণ শুধুমাত্র আর্থিক নয়, এটি মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাব প্রদর্শনেরও একটি প্রতীক হবে। নোটিশে বলা হয়েছে, “মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে একজন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে। তাদের দায়িত্বশীলতার অভাবের ফলে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং পরিবারের একজন সদস্যকে স্থায়ী চাকরি দেওয়া জনহিতকর ও ন্যায্য দাবি।”
নোটিশটি পাঠানোর পর পরিবার ও আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করেছেন, প্রশাসন দ্রুত এই দাবির প্রতি সম্মান দেখাবে এবং আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে ক্ষতিপূরণ প্রদান ও চাকরির বিষয়টি সমাধান করবে। পরিবার বলেছে, তারা শুধুমাত্র আর্থিক সাহায্যই নয়, একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ এবং মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বশীলতা চায়।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এই নোটিশের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে পূর্ববর্তী ঘটনার পর প্রশাসন এবং মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ সাধারণত প্রাথমিক তদন্তের পর ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন, যাতে জনসাধারণের জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে।
আইনি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের নোটিশ শুধু ক্ষতিপূরণের দাবি নয়, এটি মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনার দায়বদ্ধতা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের প্রতি চাপও সৃষ্টি করে। তারা বলছেন, “মেট্রোরেল চলাচলকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মূল দায়িত্ব। যে কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে দ্রুত এবং যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।”
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এটি একটি প্রাথমিক আইনি পদক্ষেপ। যদি ৩০ দিনের মধ্যে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং পরিবারের একজনকে স্থায়ী চাকরি দেওয়া না হয়, তাহলে পরিবার আদালতে মামলা দায়ের করে আইনগতভাবে আরও জোরালো দাবি তুলতে পারবে। এটি ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং মৃত্যুবরণকারীর পরিবারের নিরাপত্তার প্রতি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে।
স্থানীয় আইনজীবী ও সিভিল রাইটস বিশেষজ্ঞরা বলেন, “মেট্রোরেল পরিচালনায় যদি প্রশাসনের গাফিলতি থাকে, তাহলে এমন নোটিশ এবং আইনি পদক্ষেপ অবশ্যম্ভাবী। এটি ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হবে।”
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা শুধু আর্থিক নিরাপত্তা চাইছেন না; তারা চাইছেন প্রশাসন জননিরাপত্তার বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হোক। তারা আশাবাদী, এই নোটিশের মাধ্যমে মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।
বিচার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের আইনি নোটিশ জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ দাবি নয়, বরং নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা এবং সরকারি দায়িত্বের প্রতি সচেতনতা বাড়াতে সহায়তা করবে। এর ফলে মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত হবে।
সার্বিকভাবে, ফার্মগেট মেট্রোরেল দুর্ঘটনা এবং আইনি নোটিশের ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শহরের জনপরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব হলো শুধু যানবাহন পরিচালনা করা নয়, বরং যাত্রী এবং সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করা। এই নোটিশ একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে জনসাধারণের আস্থা পুনঃস্থাপন করা সম্ভব।