প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
খুলনা নগরীর দৌলতপুর থানা এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সোমবার গভীর রাতে একের পর এক দুটি বাড়িতে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যা মুহূর্তেই পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, মধ্যরাতের নীরবতা ভেঙে গুলির শব্দে চারদিক কেঁপে ওঠে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও এলাকাবাসী এখনো ভয়ে অস্থির। পুলিশ বলছে, ঘটনাটি পরিকল্পিত এবং এর পেছনে স্থানীয় দ্বন্দ্ব বা প্রতিশোধপরায়ণতা থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
দৌলতপুর থানার কার্তিককূল ও পশ্চিমপাড়া এলাকায় মঙ্গলবার ভোররাতে দুটি বাড়ি লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা মোট ১৫ রাউন্ড গুলি চালায়। প্রথমে কার্তিককূল এলাকায় কুয়েটের (খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) কর্মচারী মোহাম্মদ মহসিন শেখ লিটুর বাড়ি লক্ষ্য করে ছয় রাউন্ড গুলি করা হয়, পরে পশ্চিমপাড়ার কথিত মাদক ব্যবসায়ী কানা মেহেদীর বাড়ি লক্ষ্য করে আরও নয় রাউন্ড গুলি চালানো হয়।
ঘটনার পরপরই পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে এবং আশেপাশের সিসি টিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। ফুটেজে দেখা যায়, চারটি মোটরসাইকেলে করে অন্তত সাত থেকে আটজন মুখোশধারী যুবক এলাকায় প্রবেশ করে। তাদের সবাই হেলমেট পরা অবস্থায় ছিল, ফলে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা প্রথমে লিটুর বাড়ির সামনে থামে এবং হঠাৎই পরপর গুলি ছোড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এক ধরনের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে থাকতে পারে, কারণ গুলির শব্দ ছিল খুব জোরালো এবং দ্রুত গতির।
প্রথম গুলিবর্ষণের পর প্রায় ১০ মিনিটের ব্যবধানে একই দল পশ্চিমপাড়ার মেহেদীর বাড়ির সামনে গিয়ে আরও নয় রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলি ছোড়ার পরপরই তারা দ্রুত মোটরসাইকেলে চড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলির শব্দে আশপাশের লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে সাহস পাননি। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল ঘিরে রাখে এবং আশপাশের এলাকায় টহল জোরদার করে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিক ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাস্থল থেকে মোট ১৫টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে ৬টি লিটুর বাড়ির সামনে এবং ৯টি পশ্চিমপাড়ার বাড়ির সামনে পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, “ঘটনার পেছনে স্থানীয় কোন্দল, পূর্ব বিরোধ বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থাকতে পারে। আমরা সিসি টিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি এবং অভিযুক্তদের শনাক্তে কাজ চলছে।”
লিটু জানান, তিনি কুয়েটে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত এবং সম্প্রতি তার সঙ্গে স্থানীয় একদল লোকের সামান্য বিরোধ হয়। তবে সেটি এতটা মারাত্মক পর্যায়ে যাবে বলে কখনোই ভাবেননি। তিনি বলেন, “ভোরের দিকে হঠাৎই গুলির শব্দ শুনে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতর লুকিয়ে পড়ি। বাইরে তাকিয়ে দেখি মোটরসাইকেল নিয়ে কয়েকজন দৌড়ে চলে যাচ্ছে।”
অন্যদিকে, পশ্চিমপাড়ার মেহেদী নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি তার একটি লেনদেন নিয়ে অন্য একদল মাদক চক্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পুলিশ এই দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “প্রাথমিকভাবে এটি একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর পরিকল্পিত হামলা বলে মনে হচ্ছে। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তারা এলাকাকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা কয়েকজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করেছি। শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হবে।”
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গত কয়েক মাস ধরে দৌলতপুরে সন্ত্রাসী তৎপরতা বেড়ে গেছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, এমনকি ছোটখাটো বিরোধের জেরে গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। এরই ধারাবাহিকতায় এই দুই বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তারা মনে করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরি, কিন্তু এখন মনে হয় ঘরেও নিরাপত্তা নেই। পুলিশি টহল বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি।”
খুলনা শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপ রয়েছে। কয়েকদিন আগে দৌলতপুরেরই খানজাহান আলী সড়কে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটে। তার কয়েকদিনের মধ্যেই এই গুলিবর্ষণ, যা পুরো খুলনাজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এলাকার জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, পুলিশ যদি দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে না পারে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। দৌলতপুরের স্থানীয় কাউন্সিলর বলেন, “এলাকাবাসী এখন রাতে ঘুমাতে পারছে না। সবাই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করুক।”
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গুলির খোসা ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করেছে। এ ঘটনায় দৌলতপুর থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে মোবাইল ফোনের কললিস্ট, মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন এবং সিসি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত হতাহতের কোনো খবর না পাওয়া গেলেও স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গুলির ঘটনার পর থেকেই এলাকায় অঘোষিতভাবে রাতের পর জনসমাগম কমে গেছে। দোকানপাটও আগেভাগে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খুলনার এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে উদ্বিগ্ন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিক্ষিত শ্রেণি প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
খুলনা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট ছোট অপরাধচক্র এখন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। প্রশাসন বলছে, দৌলতপুরসহ আশপাশের এলাকায় অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান শুরু হবে।
ঘটনার তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও পুলিশ নিশ্চিত করেছে, যাদের লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে, তাদের কেউই সাধারণ মানুষ নন। কারও রাজনৈতিক যোগাযোগ, কারও ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আবার কারও বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তোলার অধিকার কারো নেই।
এলাকার মানুষ এখন একটাই দাবি জানাচ্ছে—দৌলতপুরের এই ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনা যেন দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয় এবং শহরের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার করা হয়। খুলনার ইতিহাসে এরকম এক রাতে দুই বাড়িতে গুলিবর্ষণ সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে নজিরবিহীন ঘটনা বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
খুলনার দৌলতপুরে এই গুলিবর্ষণের ঘটনায় এখন পুরো এলাকা জুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—কারা এই হামলার নেপথ্যে, এবং তাদের উদ্দেশ্য কী? তদন্তের অগ্রগতি ও পুলিশি পদক্ষেপের ওপরই এখন নির্ভর করছে এলাকাবাসীর নিরাপত্তা ও শান্তি ফিরিয়ে আনার ভবিষ্যৎ।










