প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চট্টগ্রাম নগরের সাগরিকা রেলগেট এলাকায় ভোররাতে ঘটে গেল এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা, যা মুহূর্তেই এলাকার পরিবেশ নিস্তব্ধ করে দেয়। একটি চালবাহী ট্রাক ও কনটেইনারবাহী মালবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন রেলগেটের নিরাপত্তা প্রহরী শামসুল হাই আলম (৫০)। এ দুর্ঘটনায় ট্রেনের একটি কনটেইনার উল্টে যায় এবং ট্রেনের ইঞ্জিনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সকাল পর্যন্ত পুরো এলাকায় দুর্ঘটনার ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা দেখতে ভিড় জমায় স্থানীয়রা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে সাগরিকা স্টেডিয়াম সংলগ্ন রেলগেট দিয়ে একটি মালবাহী ট্রেন ধীরে ধীরে অতিক্রম করছিল। এ সময় পোর্ট সংলগ্ন দিক থেকে আসা একটি চালবাহী ট্রাক দ্রুতগতিতে রেললাইন অতিক্রমের চেষ্টা করে এবং ট্রেনটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের মুহূর্তেই প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। গেটের নিরাপত্তা প্রহরী শামসুল হাই আলম ঘটনাস্থলেই চালের বস্তার নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাকটি অতিরিক্ত গতিতে ছিল এবং গেট নামানোর আগেই চালক ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করেন, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।
স্থানীয় এক দোকানদার মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমি দোকান খুলছিলাম, তখনই দেখি রেলগেট বন্ধ হচ্ছে। ঠিক সেই সময় এক ট্রাক এসে জোরে ব্রেক কষে, কিন্তু আর থামতে পারেনি। মুহূর্তের মধ্যে ট্রেন এসে ধাক্কা দেয়। একবারে বিকট শব্দ হয়, মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হয়েছে। ধোঁয়া আর ধুলায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।”
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে ট্রাকচালক ও সহকারীকে উদ্ধার করেন, তারা সামান্য আহত হন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় ট্রেনের উল্টে যাওয়া কনটেইনার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাক সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ততক্ষণে সাগরিকা এলাকার উভয় পাশেই যানজট সৃষ্টি হয়।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, “ভোরে সাগরিকা রেলগেট এলাকায় ট্রাক ও ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিরাপত্তা প্রহরীর মৃত্যু হয়েছে। আমরা মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছি। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।”
এদিকে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনার কারণ নিরূপণে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাকচালক অসাবধানতার কারণে গেটের সংকেত অমান্য করে ঢুকে পড়েছিলেন।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় রেলগেটের সিগন্যাল লাইট চালু ছিল এবং লালবাতি জ্বলছিল। তবুও ট্রাকটি থামেনি। রেলওয়ে কর্মীদের দাবি, তারা বারবার বাঁশি বাজিয়ে ট্রাকচালককে সতর্ক করেছিল, কিন্তু চালক সেটি উপেক্ষা করেন। সিসি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঠিক কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
নিহত শামসুল হাই আলম প্রায় ১৫ বছর ধরে ওই রেলগেটে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার সহকর্মীরা বলেন, তিনি দায়িত্বশীল এবং পরিশ্রমী কর্মী ছিলেন। প্রতিদিন ভোরে ডিউটিতে এসে ট্রেন চলাচলের সময় গেট বন্ধ রাখতেন এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। এমন এক দায়িত্বশীল কর্মীর প্রাণ হারানোয় সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তার এক সহকর্মী আবদুর রশিদ বলেন, “শামসুল ভাই নিজের কাজটা খুব যত্ন নিয়ে করতেন। আজও তিনি গেট নামানোর আগে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে ট্রেনটা পার হয়ে যাক। কিন্তু ট্রাকটা এত দ্রুত চলে আসে যে, কিছু করার সুযোগই পাননি।”
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, শামসুল হাই আলম ঘটনাস্থলেই মারা যান। তার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার পর থেকে সাগরিকা এলাকার রেললাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে। এতে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি ট্রেনের সময়সূচি বিঘ্নিত হয়। পরে সকাল আটটার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এই দুর্ঘটনা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, সাগরিকা রেলগেটে নিয়মিতভাবে ভারী যানবাহন দ্রুতগতিতে রেললাইন পার হয়। গেটম্যানদের সংকেত ও বাঁশির আওয়াজ অমান্য করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রায়ই তৈরি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, চালকরা গেট পুরোপুরি নামানোর আগেই জোর করে পার হতে চান। স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা বেগম বলেন, “প্রতিদিন এই রেলগেটে এমন ঘটনা ঘটার উপক্রম হয়। আজ একজন মারা গেলেন, কাল কে জানে কার পালা?”
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় প্রায় ৪০টির বেশি লেভেল ক্রসিং রয়েছে, যার বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, আবার অনেক ক্রসিংয়ে কর্মী সংকটও রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া ট্রাকচালককে আটক করার চেষ্টা চলছে। তার পরিচয় শনাক্ত করতে ট্রাকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ট্র্যাক করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ট্রাকটি একটি বেসরকারি পরিবহন সংস্থার মালিকানাধীন।
এদিকে নিহত প্রহরীর পরিবার শোকাহত। শামসুল হাই আলমের স্ত্রী মমতাজ বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “প্রতিদিনের মতো আজও ভোরে ডিউটিতে গিয়েছিলো। কে জানতো আজই শেষ ডিউটি!” তাদের তিন সন্তান—দুই মেয়ে ও এক ছেলে—এখন পিতৃহারা হয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছে। পরিবারটি রেলওয়ের কাছ থেকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও চাকরির দাবি জানিয়েছে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহত প্রহরীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হবে। বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, “আমরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তদন্ত শেষ হলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে।”