বয়স্ক ভাতা প্রদানে প্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
বয়স্ক ভাতা প্রদানে প্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি হলো বয়স্ক ভাতা। দীর্ঘদিন ধরে এটি দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এক অনন্য সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। তবে এত বছর পরও প্রকৃত উপকারভোগীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা এবং ভাতা বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে। এবার সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রথমবারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস. মুরশিদ বলেছেন, “বয়স্ক ভাতা প্রদানে প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপ কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং এটি হবে অন্তর্বর্তী সরকারের সামাজিক কল্যাণ নীতির একটি মাইলফলক।”

তিনি মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত “বয়স্ক ভাতার সুবিধাভোগীদের তালিকা/তথ্যাদি হালনাগাদকরণ কার্যক্রমের (প্রথম পর্যায়)” উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন।

উপদেষ্টা জানান, দেশের ৮টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে বয়স্ক ভাতাভোগীদের তথ্য হালনাগাদকরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, ময়মনসিংহের গৌরিপুর, রংপুরের তারাগঞ্জ, নওগাঁর নেয়ামতপুর, খাগড়াছড়ির রামগড় এবং গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এই কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে।

ভারতে পালানোর পথে ‘আজিজুল ইসলাম আজিজ’ : শামীম ওসমানের সহযোগী গ্রেপ্তার

অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া জুম প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন ৮ জেলার জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সমাজসেবা অফিসার ও ভাতাভোগীরা।

উপদেষ্টা শারমীন মুরশিদ বলেন, “আমরা এমন একটি সিস্টেম তৈরি করতে চাই, যা দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রভাবমুক্ত থেকে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা নিশ্চিত করবে। এজন্য বয়স্ক ভাতা প্রদানে প্রথমবারের মতো একটি কেন্দ্রীভূত Management Information System (MIS) চালু করা হচ্ছে, যেখানে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে উপকারভোগীদের তথ্য যাচাই করা হবে।”

এছাড়া, Proxy Means Test (PMT Score) ব্যবস্থার মাধ্যমে ভাতাভোগীদের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা যাচাই করে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাতাভোগীর প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই করা সম্ভব হবে এবং যারা যোগ্য নন, তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে জানান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, “ভাতার জন্য প্রকৃত দরিদ্র ও বয়স্ক নাগরিকদের চিহ্নিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভাতাভোগীদের মধ্যে অনেকেই সামর্থ্যবান বা এমনকি মৃত ব্যক্তিও রয়েছেন। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। তাই এই ডাটাবেজের মাধ্যমে এমন ত্রুটিগুলো নির্মূল করা হবে।”

বাংলাদেশে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি চালু হয় ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে। প্রথম দিকে এই কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় চার লাখ। বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬১ লক্ষে। উপদেষ্টা বলেন, “এই বৃদ্ধি যেমন সরকারের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন, তেমনি এটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য সুবিধা পরিচালনা করতে হলে একটি শক্তিশালী ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা অপরিহার্য।”

তিনি আরও বলেন, “সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকার প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে। কিন্তু সেই অর্থ প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, সেটিই এখন প্রশ্ন। সঠিক উপকারভোগী নির্ধারণে যদি প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া যায়, তাহলে অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতি অনেকটাই কমে আসবে।”

উপদেষ্টা শারমীন মুরশিদ স্পষ্টভাবে বলেন, “যারা অযোগ্যভাবে ভাতা নিচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হবে। আবার যেসব দরিদ্র ও বয়স্ক নাগরিক এখনো তালিকার বাইরে রয়েছেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।” তিনি প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করতে।

এছাড়া, ভবিষ্যতে ভাতার অর্থ বিতরণেও প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে ভাতা সরাসরি উপকারভোগীর হাতে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা।

সভায় আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ বলেন, “বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হলে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এজন্য ডাটাবেজ তৈরির এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, “আমরা এখন আর কাগজ-কলমের যুগে নেই। সব কিছু ডিজিটাল হচ্ছে। সমাজকল্যাণ খাতও সেই পরিবর্তনের অংশ হতে চায়। তাই বয়স্ক ভাতার ডাটাবেজটি শুধু সুবিধাভোগীদের তালিকাই নয়, বরং একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে, যার ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও সাজানো যাবে।”

সভায় সংযুক্ত বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, অনেক এলাকায় ভাতাভোগীদের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা কঠিন, কারণ পূর্বের রেকর্ড হালনাগাদ করা হয়নি। তবে প্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেজের মাধ্যমে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

উপদেষ্টা বলেন, “এই ডাটাবেজ কেবল তথ্যের সংরক্ষণাগার নয়, এটি হবে একটি ‘লাইভ সিস্টেম’। প্রতি বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য হালনাগাদ হবে, মৃত্যুবরণকারী বা স্থান পরিবর্তনকারী ভাতাভোগীর তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে বাদ যাবে।”

তিনি আরও জানান, এই পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থ বরাদ্দের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে নতুন ভাতা প্রবর্তন বা বিদ্যমান ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি সম্পর্কেও ডাটাবেজের তথ্য সহায়ক হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশেরও বেশি হবে প্রবীণ নাগরিক। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স্ক ভাতা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, এটি প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান ও সহানুভূতির প্রতীক। এই প্রক্রিয়াটি যদি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিভিত্তিক হয়, তবে এটি শুধু সমাজকল্যাণ নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মানদণ্ডও উন্নত করবে।

সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি সামিরা ও ডনের খোঁজ মিলছে না

উপদেষ্টা শারমীন মুরশিদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা এমন একটি সিস্টেম গড়ে তুলতে চাই, যা ভবিষ্যতের সরকারগুলোও অনুসরণ করবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আমরা একটি ‘মডেল মন্ত্রণালয়’ হিসেবে দেখতে চাই—যেখানে প্রযুক্তি, মানবিকতা ও স্বচ্ছতা একসঙ্গে কাজ করবে।”

এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনার নতুন এক অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে। যদি এই পাইলট প্রকল্প সফল হয়, তাহলে এটি সারাদেশে বিস্তৃত হয়ে লাখো প্রবীণ নাগরিকের জীবনে স্বস্তি, মর্যাদা ও নিরাপত্তা বয়ে আনবে—এমনটাই আশা করছে সবাই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত