জামায়াতের ১৮ দফা ইসি-কে: নভেম্বরে গণভোট এবং প্রতীক সংক্রান্ত জোটের বিধান বহাল রাখার দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭০ বার
জামায়াত স্বাগত জানালো শেখ হাসিনার বিচারের রায়ের তারিখ

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। বিএনপির ৩৬ দফার প্রস্তাবনার পর সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনকে একটি বিশদ চিঠি দিয়েছেন, যার মধ্যে মোট ১৮ দফার সুপারিশ বা দাবি রয়েছে। দলটি জানায়, তারা নভেম্বরে গণভোটের আয়োজন করে নির্বাচন-প্রসঙ্গীয় সিদ্ধান্তকে জনমতের রায়ের ওপর ভিত্তি করতে চায়। এছাড়া জোটভিত্তিক নির্বাচন ও প্রতীকের ব্যবহার, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তৃত দাবি তোলার মাধ্যমে তারা ইসি’র কাছে সংস্কারের দাবি জানিয়ে রেখেছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ইসি’র সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। তার কথায়, বিএনপির ৩৬ দফার প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে জোটের অন্য একটি দলের পক্ষ থেকে এ ধরনের ১৮ দফার আহ্বান ইসি’র নজরে আনা হয়েছে। তবে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে কিছু ইস্যুতে মতবিরোধও তুলে ধরেছে; বিশেষত জোটীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘ভোটে প্রতীক’ ব্যবহারের বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তারা চায়, জোটের অধীনে যতই ঐক্য গড়ে উঠুক না কেন, প্রত্যেক নিবন্ধিত দল যেন তাদের নিজস্ব প্রতীকে ভোট পাবে—এই বিধান অব্যাহতি করা যাবে না বলে দলটি ইসিকে বলেছে।

ভারতে পালানোর পথে ‘আজিজুল ইসলাম আজিজ’ : শামীম ওসমানের সহযোগী গ্রেপ্তার

জামায়াতের চিঠিতে যে ১৮ দফার অনুচ্ছেদগুলো উল্লেখ রয়েছে সেগুলো মূলত নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্যেই গৃহীত হয়েছে—আইনি কাঠামো, প্রশাসনিক নিয়োগ, বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত অবস্থান, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার ব্যবহার, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা, প্রবাসী ও পোস্টাল নির্বাচকদের ভোট প্রদানের সুবিধা, এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মতো বিস্তৃত দাবি সেখানে আনা হয়েছে। বিশেষত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির পরই নভেম্বরে গণভোটের আয়োজন করার যে প্রস্তাবটি দলটি ইসি’র কাছে দাখিল করেছে, তা রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। জামায়াত মনে করে, গণঅভ্যুত্থানের জোরে যদি সংবিধান ও নিয়মাবলীর প্রতি সংশোধনী বা সার্বিক রূপান্তরের প্রয়োজন পড়ে, তাহলে সেটি জনপ্রতিনিধিত্ব ও জনমতের মাধ্যমে বৈধতা পেতে পারে—তারাই এই পদক্ষেপে উৎসাহিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের এই দাবিগুলো সময়োপযোগী হওয়া সত্ত্বেও এগুলো বাস্তবায়নযোগ্য কিনা তা যাচাইয়ের দাবি করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা ও ক্ষমতার সীমানা, সংবিধান অনুযায়ী জনমত সংগ্রহের পদ্ধতি, এবং আইনগত জটিলতা—এসব বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জামায়াতের চিঠিতে যা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো দলটি কেবল নির্দিষ্ট প্রশাসনিক সংস্কারে সন্তুষ্ট নয়, বরং জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে একটি ব্যাপক নিরাপত্তা ও ভোটগ্রহণ কাঠামো চায় যা তাদের মতে নির্বাচনকে প্রায়োগিকভাবে সুশৃঙ্খল ও বিশ্বাসযোগ্য করবে।

অর্থনীতি ও নিরাপত্তা দুই দিকেই জামায়াতের প্রস্তাবনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—তারা প্রজ্ঞাপিত ও অনিয়মিত অস্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে এবং গতকালের কমিশনের সিদ্ধান্তের আলোকে পুরনো বিতর্কিত কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে নিয়োগ না করার অনুরোধ জানিয়েছে। নির্বাচনী মাঠ সমতলকরণ ও ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য দলটি চায়, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পরিমাণে সেনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে; পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে, যাতে ভোটগ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ের প্রতিফলন পরবর্তীকালে যাচাইযোগ্য হয়। এসব দাবি ইসি’র সামনে উঠলেও বাস্তবায়নের প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি কত দ্রুত সম্ভব হবে, তা একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন রেখে যায়।

তত্ত্বীয়ভাবে জামায়াতের চাওয়া যে প্রতীক ব্যবহার সংক্রান্ত বিধানকে অপরিবর্তিত রাখা—এটি তারা উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ আদেশের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের সংশোধনীর ধারায় উল্লেখযোগ্য বলে দাবি করছে। দলটির বক্তব্য ছিল, জোটগতভাবে নির্বাচন হলেও প্রত্যেক দলকে তাদের নিজস্ব প্রতীকে ভোট গ্রহণের অধিকার থাকা উচিত; এই বিধানটি নির্বাচনব্যবস্থা সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনও সুপারিশ করেছিল, ফলে সেটি বহাল রাখার তArguem ent দিয়েছে জামায়াত। তারা মনে করে, একাধিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জোটে যদি কোনো কেন্দ্রীয় প্রতীক গ্রহণ করা হয়, তবে স্বতন্ত্র দলগুলোর স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং ভোটারদেরই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।

নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার দাবি জোরালো করা হলেও ইসির কার্যপ্রণালীর ওপর একটি বড় চাপ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যভাবে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া দেননি; তবে আইনগত ও সাংবিধানিক দিকগুলো খতিয়ে দেখার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর দাবিগুলো গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত করার জন্য একটি স্বচ্ছ সময়সীমা ও কার্যকারি রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে; নাহলে নির্বাচন প্রধানত উত্তরোত্তর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।

জামায়াতের ১৮ দফার চিঠিতে একটি অন্যতম দাবি ছিল ভোটকেন্দ্রে পোলিং ও প্রিসাইডিং অফিসার, আনসার পদে থাকা কর্মীরা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়োগে শতভাগ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। দলটি চায় প্রশাসন ও ইসি’র প্রত্যেক স্তরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা যাচাই করে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তারা আরও প্রস্তাব দিয়েছে যে, নির্বাচনী কাজে সংশ্লিষ্ট সকলকে—পোলিং কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আনসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মীদেরও—পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুযোগ দেওয়া হোক যাতে কর্মরত অবস্থায় ভোটদানে কোনো প্রকার বাধা না থাকে।

প্রবাসী ভোটারদের সুবিধা বাড়ানোর জন্য জামায়াত চায় ভোট প্রদানে ভোটার আইডি কার্ড অথবা পাসপোর্ট যেকোনো একটির মাধ্যমে ভোটারকে স্বীকৃতি দেয়া হোক এবং রেজিস্টার্ড প্রবাসী ভোটারদের তালিকা রাজনৈতিক দলগুলোকে যথাসময়ে সরবরাহ করা হোক। পাশাপাশি নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের নিয়োগে তাদের রাজনৈতিক ঝোঁক বা পক্ষপাত নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে বলে দলটি জোর দিয়ে বলেছে। এসব দাবিগুলো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সম্মানিত হলেও বাস্তবায়ন ক্ষেত্রে ইসি’র কাছে যথেষ্ট প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নেবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি সামিরা ও ডনের খোঁজ মিলছে না

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, জামায়াতের চিঠি মূলত ভোটের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর দিকেই মনোযোগী। তবে নির্বাচনী স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সকল দলের মধ্যে একটি সমঝোতা দরকার, যা দলগুলোকে সময়োপযোগী আইনগত ও প্রশাসনিক বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করতে সহায়তা করবে। যদি ইসি ও সরকার এ ধরনের সুপারিশগুলো গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই পরবর্তী নির্বাচনকে নিয়ে যে অনিশ্চয়তা রয়েছে তা অনেকটাই কমে যাবে। তবে সেক্ষেত্রে সময়সূচি, বাস্তবায়ন ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এসব তিনটি উপাদান প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সাম্প্রতিক নাট্যকাঠামো বিবেচনায় জামায়াতের এই ১৮ দফা প্রস্তাবনাকে একটি সক্রিয় রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তা যদিও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মেরুকরণ কিংবা সংবিধানগত পরিবর্তনের পথ সুগম করবে কিনা, তা নির্ভর করে ইসি’র প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক পার্টিগুলোর সমন্বয় এবং আইনি বিশ্লেষণের ওপর। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক বায়ুমণ্ডলে এই ইস্যু নতুন করে উষ্ণতায় ঘনীভূত হচ্ছে এবং আগাম দিনগুলোতে তা কতটুকু প্রভাব ফেলে তা সময়ই বলবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত