১৬ বছর পর ইইউ’র পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ দল আসছে বাংলাদেশে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
১৬ বছর পর ইইউ’র পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ দল আসছে বাংলাদেশে

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

১৬ বছর পর আবারও বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ দল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, ২০০৮ সালের পর এটাই হবে ইইউ’র প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। এ ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, কূটনৈতিক মহল এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে এ তথ্য জানান বাংলাদেশের ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি জানান, ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে ইতিমধ্যেই দলটির প্রাথমিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন সদস্য থাকবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁদের মধ্যে একটি অংশ নির্বাচনের ছয় সপ্তাহ আগে বাংলাদেশে এসে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে, আর বাকি সদস্যরা ভোটের প্রায় এক সপ্তাহ আগে যোগ দেবেন।

সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি সামিরা ও ডনের খোঁজ মিলছে না

রাষ্ট্রদূত মিলার বলেন, “২০০৮ সালের পর এই প্রথম আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের আস্থার প্রতিফলন।” তিনি আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুধু বিদেশি পর্যবেক্ষক পাঠানোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশীয় পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও সহায়তা করবে।

বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন প্রস্তুতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, শ্রম খাত সংস্কার, এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনের নানা বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। রাষ্ট্রদূত মিলার বাংলাদেশের জুলাই মাসে ঘোষিত জাতীয় সনদ (National Charter)–কে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই সনদ দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

রাষ্ট্রদূত সদ্য অনুমোদিত শ্রম আইন সংস্কার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদারের পদক্ষেপগুলোকেও প্রশংসা করেন। তাঁর ভাষায়, “এসবই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা চাই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হোক—যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করবে।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে ইইউ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও পরামর্শমূলক সহায়তা অব্যাহত রাখবে।

বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের বিষয়েও বিস্তৃত আলোচনা হয়। রাষ্ট্রদূত মিলার জানান, ইইউ ও বাংলাদেশ এখন একটি “অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি” (Economic Partnership Agreement) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা যাচাই করছে। তিনি বলেন, এই চুক্তি হলে বাংলাদেশ ইউরোপীয় বাজারে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে, বিশেষ করে দেশের রপ্তানি খাতে নতুন গতি আনবে। উভয়পক্ষ বিমান ও নৌপরিবহন খাতে সহযোগিতার নতুন সুযোগ নিয়েও আলোচনা করে।

মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন রোধে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন উভয় পক্ষ। রাষ্ট্রদূত মিলার বলেন, “ইইউ এই বিষয়গুলোতে বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে। আমাদের যৌথ প্রচেষ্টা কেবল নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই নয়, মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য বিশ্ববিখ্যাত ড্যানিশ শিপিং কোম্পানি এ.পি. মোলার–ম্যার্সকের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে, যা লালদিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক টার্মিনালে পরিণত করবে। রাষ্ট্রদূত মিলার এ পরিকল্পনাকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য “একটি মাইলফলক প্রকল্প” বলে উল্লেখ করেন।

বৈঠকের শেষ পর্যায়ে উভয়পক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই প্রক্রিয়া, মানবাধিকার রক্ষা, এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করে। রাষ্ট্রদূত মিলার বলেন, “স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রধান শর্ত। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে উদাহরণ স্থাপন করতে পারবে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইইউ’র এই পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ মিশন ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এতে নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে এবং প্রার্থীরা আরও দায়িত্বশীল আচরণে উদ্বুদ্ধ হবেন। অন্যদিকে, এটি সরকারের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা, যা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন মাত্রা দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত