ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে অনৈক্য দেখছে বিএনপি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে খালেদা জিয়া অম্লান: সালাহউদ্দিন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে জাতীয় অনৈক্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, “জুলাই সনদে থাকা সুপারিশ অনুযায়ী ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদ পাস না করলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়ে যাবে—এমন ধারণা একেবারেই হাস্যকর। পরীক্ষায় অটোপাসের মতো বিষয় সংবিধানে থাকতে পারে না। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এভাবে যেন দায় এড়ানোর পথ খুঁজছে।”

মঙ্গলবার সচিবালয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর মতে, কমিশনের এই সুপারিশ শুধু সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী নয়, বরং এটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করবে।

বিএনপি নেতা অভিযোগ করেন, জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত মূল চুক্তিতে যেসব নোট অব ডিসেন্ট বা মতবিরোধের মন্তব্য যুক্ত ছিল, তা পরবর্তীতে কমিশনের সুপারিশপত্রে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “৮৪ দফার ওই সনদে আমাদের এবং অন্য দলগুলোর কিছু নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, যেসব বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট দল নির্বাচনে ম্যান্ডেট পেলে বাস্তবায়ন করতে পারবে। কিন্তু আজ কমিশনের রিপোর্টে দেখা গেল, এসব নোট অব ডিসেন্ট পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে, যেন কখনো ছিলই না।”

সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, ঐকমত্য কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এমন কিছু সুপারিশ সংযুক্ত করা হয়েছে, যা কখনো আলোচিতই হয়নি। “সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে যে ধারণা এখন রিপোর্টে যুক্ত করা হয়েছে, তা কমিশনের আলোচনার টেবিলে ছিল না,” বলেন তিনি। “কোনো সভায় এটি প্রস্তাবিত হয়নি, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে কোনো ঐকমত্যও হয়নি। এটা নতুন করে অনৈক্য সৃষ্টির অপচেষ্টা।”

তিনি আরও জানান, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রের চেতনায় বিশ্বাসী এবং জোটভুক্ত নির্বাচন হলেও প্রত্যেক দলের নিজস্ব প্রতীকে ভোটে অংশ নেওয়া উচিত বলে মনে করে। এই অবস্থান থেকে আরপিও-তে (Representation of the People Order) আগের আইন বহাল রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। আইন উপদেষ্টা এ বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

বিএনপি নেতা বলেন, “ঐকমত্য কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, এজন্য আমরা ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এই প্রতিবেদন অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য নয়, বরং জাতীয় অনৈক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল দায়মুক্তি অর্জন করা, প্রকৃত সমাধান নয়।”

ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো দল বলেনি যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। সরকারের প্রস্তুতিতে আমরা আশ্বস্ত—নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হবে।” তবে বিএনপি এনসিপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে যাবে কি না, সে বিষয়ে তিনি বলেন, “এখনই সেই সিদ্ধান্ত জানানোর সময় আসেনি। কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছে, সেটি পর্যালোচনা করে দু’-এক দিনের মধ্যেই বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মতামত জানাবে।”

গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় এলে রাজনৈতিক দলগুলো সেই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে নোট অব ডিসেন্টসহ। তাই গণভোটের পর যদি সনদ কার্যকর হয়, তবে সেটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নোট অব ডিসেন্টের ধারাসহ করতে হবে।”

তিনি অভিযোগ করেন, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে উচ্চকক্ষ বা আপার হাউস গঠনের বিষয়েও গোপন পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “রিপোর্টে বলা হয়েছে নিম্নকক্ষের ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অথচ কমিশনের বৈঠকগুলোতে কখনো এমন সিদ্ধান্ত হয়নি। ঐকমত্য হয়েছিল, উচ্চকক্ষ হবে ১০০ সদস্যের, কিন্তু নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, সুপারিশে একে স্বতন্ত্রভাবে যুক্ত করা হয়েছে।”

উচ্চকক্ষের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। “কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, অর্থ বিল ও আস্থা ভোট বাদে অন্যান্য বিষয় উচ্চকক্ষে উত্থাপন করা যাবে। অথচ নোট অব ডিসেন্টে আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছিলাম—যেহেতু উচ্চকক্ষ সরাসরি নির্বাচিত নয়, তারা সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। জনগণের সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার কারও নেই,” বলেন বিএনপি নেতা।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের ২৭০ দিনের মধ্যে পাস না হওয়া প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হওয়ার সুপারিশ নিয়ে তিনি বলেন, “এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সংবিধান সংশোধনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অটোপাসের নিয়ম থাকতে পারে না। আইন প্রণয়ন ও অনুমোদনের একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া আছে—যেখানে সংসদ, স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন অপরিহার্য। এই প্রক্রিয়া এড়িয়ে গিয়ে প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন হয়ে যাবে—এমন ধারণা সংবিধানের মূল দর্শনের পরিপন্থী।”

তিনি বলেন, “একটা বিষয় বোঝা দরকার—সংবিধান কোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নয়, যেখানে অটোপাস দেওয়া যায়। এটা দেশের মৌলিক নীতিমালা। যারা এই সুপারিশ করেছেন, তাঁরা যেন দায়মুক্তি খুঁজছেন, দায়িত্বশীলতা নয়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সালাহউদ্দিন আহমদের এই প্রতিক্রিয়া শুধু বিএনপি’র অবস্থানই নয়, বরং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি প্রতিফলন। তাঁরা মনে করেন, কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করা গেলে আগামীর নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে।

এদিকে, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবগুলো সরকার গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করবে। তিনি বলেন, “কমিশনের কাজ ছিল পরামর্শ দেওয়া। এখন সরকারকে দেখতে হবে, সংবিধান ও আইনের আলোকে কোন প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য।”

সবশেষে, সালাহউদ্দিন আহমদ আশা প্রকাশ করেন, “সরকার আইনানুগ ও সাংবিধানিক ভিত্তিতে বিষয়গুলো বিবেচনা করবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যদি সত্যিই ঐকমত্য চায়, তবে তাদের উচিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।”

রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদন কি সত্যিই ঐক্য আনবে, নাকি নতুন অনৈক্যের সূচনা করবে? সময়ই হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত