সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের রহস্যময় জীবন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৯ বার
সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের রহস্যময় জীবন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে ‘আজিজ মোহাম্মদ ভাই’ নামটি যেন এক রহস্যের প্রতীক। একদিকে তিনি ব্যবসায়ী, প্রযোজক ও সমাজের ধনী শ্রেণির প্রভাবশালী মানুষ; অন্যদিকে তার নাম জড়িয়ে আছে বহু বিতর্ক, নারী, ক্ষমতা, মাদক ও হত্যার অন্ধকার গল্পে। সম্প্রতি সালমান শাহর মৃত্যুর দীর্ঘ ২৯ বছর পর যখন সেই মামলার অভিযোগপত্রে আবারও উঠে এসেছে তার নাম, তখন নতুন প্রজন্মের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—কে এই আজিজ মোহাম্মদ ভাই?

আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর হত্যার সঙ্গে জড়িত। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে সালমানের স্ত্রী সামিরা হককে, আর আজিজ মোহাম্মদ ভাই রয়েছেন ১১ আসামির তালিকায়। দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন ছিল, এই মৃত্যুর পেছনে রয়েছে জটিল সম্পর্ক ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ছায়া।

আজিজ মোহাম্মদের নামের শেষে ‘ভাই’ শব্দটি নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা কৌতূহল। অনেকে ভেবে নেন, তিনি নাকি চলচ্চিত্র জগতের কোনো ‘গডফাদার’, তাই সবাই তাকে ‘ভাই’ বলে ডাকেন। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। ‘ভাই’ তাদের পরিবারের বংশপদবী। পুরান ঢাকার এই ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের সবার নামের শেষে ‘ভাই’ থাকে, এমনকি নারীদের ক্ষেত্রেও। তার বাবার নাম ছিল মোহাম্মদ ভাই, আর মায়ের নাম খাদিজা মোহাম্মদ ভাই।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাদের পরিবার ভারতের গুজরাট থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। তাদের বংশ পারস্য-উৎপত্তি “বাহাইয়ান” সম্প্রদায়ের, যাকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘বাহাই’। উচ্চারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘বাহাই’ রূপ নেয় ‘ভাই’-এ। পুরান ঢাকায় বসবাস শুরু করার পর থেকেই এই পরিবার দ্রুতই হয়ে ওঠে ব্যবসা ও সমাজ জীবনের অন্যতম প্রভাবশালী পরিবার।

১৯৬২ সালে আরমানিটোলায় জন্ম নেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। পারিবারিক ব্যবসার ধারাবাহিকতায় তিনিও পা রাখেন বাণিজ্যের জগতে। কিন্তু তার সাফল্যের পথ ছিল বিতর্কে ঘেরা। একদিকে হোটেল, রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য—ঢাকা থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং ও সিঙ্গাপুর পর্যন্ত তার ব্যবসার নেটওয়ার্ক। অন্যদিকে, মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অর্থপাচারের অভিযোগও তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে।

তিনি সার্ক চেম্বারের আজীবন সদস্য এবং কথিত আছে, ভারতের পলাতক মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই কথিত যোগসূত্রই তাকে বাংলাদেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

১৯৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নাম লেখান আজিজ মোহাম্মদ ভাই। ‘এমবি ফিল্মস’ ব্যানারে তিনি প্রায় ৫০টির মতো চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। কেউ বলেন, তিনি চলচ্চিত্রকে ভালোবাসতেন; কেউ বলেন, নায়িকাদের প্রতি মোহ বা কালো টাকা সাদা করার প্রয়োজনে প্রযোজনায় আসেন; আবার অনেকে মনে করেন, কেবল মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য।

চলচ্চিত্র জগতে তিনি দ্রুতই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরিচালক, অভিনেতা, সাংবাদিক—সবাই তাকে সমীহ করতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘অলিম্পিক ব্যাটারি’ তখন বিজ্ঞাপন দুনিয়ায়ও বিপ্লব ঘটায়। “আলো আলো বেশি আলো”—এই জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনটি ছিল সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত প্রচারণা, যেখানে অভিনেত্রী মিতা নূরের উপস্থিতি দর্শকদের মন জয় করে নেয়।

তবে আলোচনার পাশাপাশি বিতর্কও ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এরশাদ সরকারের সময় এক নারীসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের কারণে তিনি একবার গ্রেফতার হন। এই ঘটনা তখনকার সমাজে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এক পত্রিকা সম্পাদককে হত্যার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে, যদিও পরবর্তীতে তা ‘হার্ট অ্যাটাক’ হিসেবে দেখানো হয়।

১৯৯৭ সালে ঘটে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা—নায়ক সালমান শাহর মৃত্যু। প্রথমে এটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও পরবর্তীতে উঠে আসে হত্যার অভিযোগ। তদন্তে একাধিকবার আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নাম আসে।

গুঞ্জন আছে, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে এক পার্টিতে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরাকে চুম্বন করেন আজিজ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সালমান নাকি সবার সামনে আজিজকে চড় মারেন। এই ঘটনাকেই অনেকে হত্যার মোটিভ হিসেবে ধরে নেন। তদন্তের সময় দু’বার আজিজকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তবে প্রমাণের অভাবে তিনি মুক্তি পান।

তবে বিতর্ক এখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৯৯ সালে ঢাকা ক্লাবের সামনে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী খুন হন। এই হত্যাকাণ্ডেও আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও তার পরিবারের নাম উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো মামলারই আজ পর্যন্ত চূড়ান্ত রায় হয়নি। কিন্তু সমাজে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নাম রয়ে গেছে ‘অস্পৃশ্য প্রভাবশালী’ হিসেবে—যাকে কেউ সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে সাহস পায় না।

বর্তমানে তিনি সপরিবারে থাইল্যান্ডে বসবাস করছেন। সেখান থেকেই তিনি নিজের ব্যবসা পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে। তার স্ত্রী নওরিন মোহাম্মদ ভাই দেশে এসে পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করেন।

চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই আজও বিশ্বাস করেন, সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের মূল সূত্র আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে কোথাও না কোথাও জড়িয়ে আছে। যদিও কোনো আদালত এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেয়নি। তবুও জনমনে প্রশ্ন—একজন ব্যবসায়ী, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও বিতর্কিত প্রভাবশালী মানুষ কেন বারবার মৃত্যুর মতো অন্ধকার অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন?

সালমান শাহর অকাল মৃত্যু শুধু একজন তারকার হারানোর গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাময় অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ে আজও রয়ে গেছে আজিজ মোহাম্মদ ভাই নামের এক রহস্যময় চরিত্র, যাকে ঘিরে প্রশ্নের চেয়ে উত্তর কম।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত